সৈয়দপুর শহরজুড়ে ভিক্ষুকের ছড়াছড়ি। প্রতিদিনই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের আনাগোনা। বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অফিসগুলোতে সরব পদচারণা। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ব্যাপকভাবে মাঠে নামে নানা বয়সী ভিক্ষুকেরা। এদিন যেন তাদের সাপ্তাহিক ঈদ তথা বিশেষ দিবস।
এ দিবসে সর্বাত্মক প্রাপ্তি ঘটে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত ভিক্ষুকদের ঝামেলা এড়াতে অন্যদিনগুলোতে ভিক্ষা না দিয়ে সপ্তাহের শেষ দিনে সার্বজনীনভাবে দান করে। তাই বৃহস্পতিবার অন্যদিনের চেয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ গুণ বেশি ভিক্ষুকের সমাগম ঘটে।
কারণ এদিন সৈয়দপুর তথা নীলফামারী জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি রংপুর-দিনাজপুরসহ সুদূর জয়পুরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁ, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট থেকেও ভিক্ষুক আসে। একক বা দলবেঁধে তারা ভিক্ষা করে। কখনও কখনও একসাথে ৫ থেকে ১০ জনও ধরনা দেয়।
এতে প্রতি বৃহস্পতিবারই অন্যরকম এক দৃশ্যের অবতারণা হয় নীলফামারীর সৈয়দপুরে। দোকানে দোকানে সারিবদ্ধ উপস্থিতি চোখে পড়ে বিভিন্ন বয়সী ভিক্ষুকদের। ৩ মার্চ শহরের শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কে প্রেসক্লাবের সামনে ভিক্ষা করতে আসা কয়েকজন ভিক্ষুকের সাথে কথা হয়।
এসময় দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে আসা বৃদ্ধা পারভীন বেগম (৬০) বলেন, প্রায় প্রতিদিনই সৈয়দপুরে আসি। অন্যদিনে শহরের বাসাবাড়িতে ভিক্ষ করি। কিছু কিছু দোকানেও পাই। কিন্তু সপ্তাহের অন্যদিন আসলে ব্যাবসায়ীরা ভিক্ষা দিতে চায়না। তারা বৃহস্পতিবার আসতে বলেন। এদিন অধিকাংশ দোকানে গেলেই অনায়াসে পাওয়া যায়। অনেকে অন্যদিনের চেয়ে বেশিই দেয়।
একই জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার আব্দুল মজিদ (৫৫) জানান, সচরাচর নিজ এলাকাতেই ভিক্ষা করলেও প্রতি বৃহস্পতিবার সৈয়দপুরে আসি। কারণ এদিন এখানে অনেক বেশি ভিক্ষা পাওয়া যায়। তবে আমার মত আরও অনেক জায়গা থেকে বেশি পরিমানে লোক আসায় আয় কমে গেছে। তবে ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে দান করায় অন্যদিনের চেয়ে বেশিই পাওয়া যায়।
সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট এলাকার জামিলা (৪৭), মুন্সিপাড়ার হাজরা (৫২) নীলফামারী সদর উপজেলার দারোয়ানি টেক্সটাইল মিল এলাকার মোমেনা বলেন, তারা দলবেঁধে ভিক্ষা করে। শুক্রবার থেকে বুধবার পর্যন্ত শহরের পাড়া মহল্লায় ঘুরি। বৃহস্পতিবার বাজার এলাকায় দোকানে দোকানে এবং অফিসগুলোতে বেড়াই। সপ্তাহের বাকী ছয়দিনের চেয়ে এদিন বেশী উপার্জন হয়।
সৈয়দপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন টাটা ষ্টীল নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী দুলাল হোসেন বলেন, সৈয়দপুরে ফকিরের চরম উপদ্রব। প্রতিদিনই ব্যপক সংখ্যক ভিক্ষুকের আগমন ঘটে দোকানে। তাদের সামাল দেয়া বেশ জটিল হয়ে পড়ে। সবসময় তারা আসায় ব্যবসা করাও দূরহ হয়ে পড়ে। একারনে আগত সব ফকিরকে বলা আছে বৃহস্পতিবার আসার কথা। এতে অন্যদিন তাদের বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এভাবে প্রায় সব ব্যবসায়ীই বৃহস্পতিবারকে ফকিরকে দান করার জন্য বেছে নেয়ায় দিনটি যেন সাপ্তাহিক ভিক্ষা দিবসে পরিণত হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরাও যেমন স্বস্তি পেয়েছে। তেমনি ভিক্ষুকেরাও একই জায়গায় প্রতিদিন ঘোরার পরিশ্রম থেকে মুক্তি পেয়েছে।
একইভাবে মন্তব্য করেন, সৈয়দপুর প্লাজা মার্কেটের ইত্যাদি প্রেসের মালিক মুন্না, শহীদ তুলশীরাম সড়কের বিসিআইসি সার ও কীটনাশক ডিলার রেজাউল করিম সূর্য, বঙ্গবন্ধু সড়কের রাজু মেডিসিন স্টোরের আজাদ সহ অনেকে। তারা বলেন, ভিক্ষুকরা মূলতঃ আমাদের দানের আশায় থাকে। এই টাকা দিয়েই তারা জীনব নির্বাহ করে।
তাই আমরাও সামর্থ্যানুযায়ী চেষ্টা করি দান করার। কিন্তু প্রতিদিনই এই ঝামেলা এড়াতে সপ্তাহের একটা দিন বেছে নিয়ে ভিক্ষুকদের দান করি। এইদিন সকালে টেবিলের উপর একটা পাত্রে খুচরা কয়েন রেখে দেই। আগে ১ টাকার কয়েন দিলেই হতো। এখন ২ টাকার কম নেয়না। অনেক ক্ষেত্রে অতি বয়স্ক, অসুস্থ, দূর্বল ও নিরীহ অবস্থা ভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়।
তবে প্রকৃত দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের চাইতে সুস্থ-সবল ও কমবয়সীরাও ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছে। এতে ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। ফলে সত্যিকার অর্থে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা যথার্থ টাকা পাচ্ছেনা। ব্যস্থতার কারনে আমরাও যাচাই করে দেওয়ার সময় পাইনা। সেই সুযোগে সামর্থ্যবানরা আগেভাগেই টেবিল থেকে টাকা নিয়ে যায়। প্রতিযোগীতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে প্রকৃতজনরা বঞ্চিত হচ্ছেন।









