- বাংলাদেশে হিট স্টোরেজ পদ্ধতি বেশি উপযোগী
বিশ্বে সাধারণত তিনটি পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হয়। প্রথমত, কোল্ডস্টোরেজ (তাপমাত্রা ০-২/৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৫-৭০ শতাংশ), দ্বিতীয়ত অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ/হিট স্টোরেজ (সাধারণ তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও ৩. আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৬৫-৭০ শতাংশ) এবং কন্ট্রোল্ড অ্যাটমোসফিয়ার স্টোরেজ (অক্সিজেন ১-২ শতাংশ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ৩ শতাংশ ও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)। নিম্ন তাপমাত্রা অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের জন্য কোল্ডস্টোরেজ উপযুক্ত পদ্ধতি।
বাংলাদেশের মতো গরম অঞ্চলের দেশে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় পেঁয়াজ সংরক্ষণ করাই উপযুক্ত পদ্ধতি, যাকে অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ বা হিট স্টোরেজ বলে। অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজে ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা পেঁয়াজে অংকুরোদগম/মূল উৎপাদনকারী হরমোন (সাইটোকাইনিন) উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ সাধারণত বাঁশের তৈরি হয়ে থাকে। বাঁশ দিয়ে এক বা দুই স্তর বিশিষ্ট মাচা/চাং তৈরি করা হয়। পেঁয়াজের মাচা বাঁশের বানা দিয়ে তৈরি করা হয়। স্টোর ঘরের চাল বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। খড়ের/অ্যাসবেসটস দিয়ে নির্মিত চাল থেকে টিন দিয়ে নির্মিত চালে বেশি তাপ উৎপন্ন হয়ে থাকে।
সংরক্ষণাগারের চাল টিনের হলে টিনের নিচে অ্যালুমিনিয়াম ইনসুলেটর দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। তা ছাড়া পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থার জন্য পেঁয়াজের মাচার চারিদিক থেকে ভেন্টিলেটারের ব্যবস্থা করতে হয়। বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে গুদামজাত রোগ ব্লাক মোল্ড/ গ্রেমোল্ড এবং নরম পঁচা রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পারে। টিন দিয়ে নির্মিত সংরক্ষণাগারে স্তূপীকৃত পেঁয়াজের পুরুত্ব ৩০ সেমি. (১২ ইঞ্চি) এবং খড় বা অ্যাসবেসটস দ্বারা নির্মিত সংরক্ষণাগারে স্তুপীকৃত পেঁয়াজের পুরুত্ব ৩৭ সেমি. (১৫ ইঞ্চি) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা ভালো। দৈনন্দিন রান্নার কাজে ব্যবহারের জন্য প্লাস্টিক বা বাঁশের তৈরি র্যাকে ১৫ সেমি. (৬ ইঞ্চি) পুরুত্বে সংরক্ষণ কর যায়।
কৃষিবিদ মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও আর্দ্রতা ৬৫-৭০ শতাংশ। যা পেঁয়াজের গুণাগুণ, রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পায়। স্টোর থেকে ১৫-২০ দিন পর পর পেঁয়াজ নামিয়ে পচা, অংকুরোদগমকৃত এবং রোগাক্রান্ত বাল্ব আলাদা করে পুণরায় সংরক্ষণ করতে হয়। এভাবে মাঝে মাঝে বাছাই না করলে পেঁয়াজের ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। পেঁয়াজ সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের ওজনেরও হ্রাস পেতে থাকে।
আবহাওয়াজনিত কারণে পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা বছর থেকে বছরে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। কৃষকপর্যায়ে ৪০০-৫০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিস্তর বিশিষ্ট একটি অ্যাম্বিয়েন্ট স্টোরেজ তৈরি করতে প্রায় ৩-৩.৫ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। এ ধরনের স্টোর প্রায় ২০-৩০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত এভাবে ভালো কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পেঁয়াজের সংরক্ষণজনিত ক্ষতির পরিমাণ গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব।
পেঁয়াজের জাত নির্বাচন
সংরক্ষণাগারে পেঁয়াজের পচন, অঙ্কুরোদগম ও ওজন হারোনোর পরিমাণ জাতভেদে কম বেশি হয়ে থাকে। দৃঢ় ও আঁটসাঁটে, ঝাঁঝ বেশি, পানি কম, আকারে মধ্যম, গলা চিকন, উচ্চ শুষ্ক পদার্থ সম্বলিত বৈশিষ্ট্যের জাতের সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি। যেমন- বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪। হাইব্রিড জাত অপেক্ষা স্থানীয় জাতের সংরক্ষণ ক্ষমতা ভালো। যে পেঁয়াজের শুষ্ক শল্কপত্রের পরিমাণ বেশি থাকে সে পেঁয়াজের সংরক্ষণকাল বেশি হয়। কিউরিং করলেই শুষ্ক শল্কপত্রের পরিমাণ বাড়ে। হলুদ ও সাদা রংবিশিষ্ট জাতের পেঁয়াজের তুলনায় লাল রং বিশিষ্ট পেঁয়াজের ফিনোলিক এসিড, এন্থোসায়ানিন, ফ্লাভোনয়েড (কুয়েরসিটিন, ক্যাম্পফেরল), পলিফেনল নামক এন্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। বারি পেঁয়াজ-৪ জাতের পেঁয়াজে এন্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। তবে লাল রং এবং সাদা রং বিশিষ্ট পেঁয়াজের তুলনায় হালকা লাল রং বারি পেঁয়াজ-১ বিশিষ্ট পেঁয়াজে শ্বসন হার কম হয়।
সংরক্ষণ পদ্ধতি
সাধারণত রবি ও খরিপ মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ হয় দেশে। পেঁয়াজ সংগ্রহের পর পাতাসহ ৫-৭ দিন হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে শুকাতে হয়। সংগ্রহের সময় আগাম বৃষ্টিতে পেঁয়াজ ভিজে গেলে দ্রুততার সাথে শুকানোর ব্যবস্থা করতে হয়। প্রয়োজনে ফ্যানের বাতাসে শুকাতে হবে। এখানে বলা ভালো, পেঁয়াজকে রোদে শুকালে ব্যাপক ক্ষতি হয়। শুকানোর পর পেঁয়াজের ৪-৫ শতাংশ ওজন হ্রাস পায় যাতে পেঁয়াজ দৃঢ় ও আঁটসাঁটে হয় এবং পেঁয়াজের গলা সংকুচিত হয়ে ছত্রাক এবং ব্যাক্টেরিয়া প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিউরিং এর ফলে শ্বসন হারও কমে যায়। অপর্যাপ্ত কিউরিং এর ফলে রোগের পরিমাণ বেড়ে যায়।
কিউরিং করার কারণে পাতা শুকিয়ে গাছের বৃদ্ধি বাধাদানকারী হরমোন পেঁয়াজে (কন্দ) প্রবেশ করে পেঁয়াজের সুপ্ততার মেয়াদ বৃদ্ধি করে। পেঁয়াজের সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধি ও গুণগতমান বজায় রাখার জন্যেই পেঁয়াজকে পাতাসহ শুকানো হয়। হালকা ছায়ায় শুকানোর কারণে পেঁয়াজের রং উজ্জ্বল হয়। পেঁয়াজ শুকানোর পর বাল্বের উপরের গলা ২.০-২.৫ সে. মি (সর্বোচ্চ ১ ইঞ্চি) রেখে পাতা কেটে দিতে হয়। পরে বাল্বের মূল কেটে পরিষ্কার করে পেঁয়াজ স্টোরে সংরক্ষণ করা হয়।









