শীতের আগমনে কাঁথা সেলাইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকেন গ্রামাঞ্চলের কিশোরী ও বধুরা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যে মিশে আছে প্রাচীন শিল্পকলার নিদর্শন এ শিল্পটি। আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এ নকশি কাঁথা। এ যেন একশিল্প নিদর্শনের মূর্ত প্রতীক। অনুপম শিল্পমাধুর্যের বাস্তব রূপ নকশি কাঁথা। কিন্তু কালের বিবর্তণে আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্পটি।
পাবনার আটঘরিয়ার নাগদহ গ্রামের গৃহবধূরা একত্রিত হয়ে মনের মাধুরী দিয়ে নকশি কাঁথা সেলাইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পুরাতন বস্ত্র দিয়ে প্রস্তুতকৃত রং-বেরংয়ের সুতা দিয়ে সুনিপুণ হাতে গড়া গ্রাম-বাংলার নান্দনিক রূপ-রস ও বর্ণ-বৈচিত্রে ভরা এ নকশি কাঁথা। যে শিল্পে মুগ্ধ হয়ে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন রচনা করেছেন তার অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ ‘নকশি কাঁথার মাঠ’। শুধু তাই নয়, এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ড।
কিন্তু বর্তমান সময়ের আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে হাতের সেলাইয়ে গড়া এ নকশি কাঁথার ঐতিহ্য। বড় বড় কারখানায় তৈরিকৃত দেশি-বিদেশী রং-বেরংয়ের রেডিমেট কাঁথা-কম্বলের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রাম-বাংলার এ দেশিয় শিল্পটি।
একসময় দেখা যেত বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের হাটে-বাজারে ও শহরের পাড়া-মহল্লার ওলিতে-গলিতে সাইকেল, ভ্যানে বেঁধে অথবা ভার বয়ে সারাদিন ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন শীত মৌসুমের ব্যবসায়ীরা। কালের বিবর্তণে আজকাল আর চোখে পড়ে না এসব নান্দনিক দৃশ্য।
একটা সময় এ হস্তশিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল। জাপান, আমেরিকা, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানী ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা ছিল ব্যাপক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আধুনিক যুগের প্রযুক্তির ভিড়ে রেডিমেটের জগতে হারিয়ে যেতে বসেছে সেসব ঐতিহ্য।
অর্থনৈতিক কর্মকান্ড হিসেবে উৎপাদন, আয়বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে এ খাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ খাতকে আরো বিকশিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কারুশিল্পীদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সকল সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানসমূহকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিরামপুর গ্রামের আলেয়া বেগম জানান, একসময় বিশেষ করে অবসর সময়ে আমাদের মা, চাচি, দাদিরা একত্রিত হয়ে পুরাতন কাপড় দিয়ে নকশি কাঁথা সেলাই করত। এখন আর সেই দৃশ্য দেখা যায় না। এ কাঁথা সেলাইয়ের কাজ গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি।
নকশি কাঁথা সেলাই বাঙালি বধূদের সংস্কৃতি। সেই বাঙালির ঐহিত্য আজ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নকশি কাঁথার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহজ ঋণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টমহল।
আনন্দবাজার/এম.আর









