বিংশ শতাব্দির বাঙালি মুসলমানের সামাজিক জাগরণে নারীর অবস্থান যারা নিশ্চিত করেছেন, তাদের একজন মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। স্বনামধন্য রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সুফিয়া কামালের পর্যায়ভুক্ত তিনি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত না হলেও সৃজনশীল মন ও বুদ্ধিবৃত্তিক মনন দিয়ে স্বকালের স্বসমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
তাঁর কবিতায় মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার আন্তরিক প্রকাশ ঘটেছে। প্রকৃতির রূপবৈচিত্র তাঁর কবিতায় প্রাণের স্পর্শ লাভ করেছে। অত্যন্ত অল্প বয়সে তাঁর কবি প্রতিভার বিকাশ ঘটে এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে।
১৯০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়া জেলার পাবনা শহরের নিয়াজতবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। মাহমুদা খাতুনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও বাড়িতেই উচ্চশিক্ষিত বাবার কাছে এবং গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠ নিয়েছেন। আর পাঠ নিয়েছেন প্রকৃতি থেকে। কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান ছিলেন তাঁর গৃহশিক্ষক।
মাহমুদা খাতুন তার আত্মকথায় লিখেছেন- ‘আমি যখন মিশন স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ি, সেই সময় কবিতা লিখতে শুরু করি। বারো কি তেরো বছর বয়সে আমার প্রথম কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয়। ছোটবেলা থেকে আমি মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম। মায়ের মৃত্যুর পর কোনো শাসন ছিল না বলেই আমার এক কৃষাণী বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতাম বনে-জঙ্গলে, পুকুর ধারে, বাড়ির পেছনে ছিল বিরাট আমবাগান। সেখানকার পাখির ডাক, বুনোফুল আমাকে মুগ্ধ করত। দু-এক লাইন করে কবিতা লিখতাম।'
১৯৩০ এর দশকের শুরুতে কবি হিসেবে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার আত্মপ্রকাশ। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি- পশারিণী, মন ও মৃত্তিকা এবং অরণ্যের সুর। এ ছাড়া কিছু প্রবন্ধ ও ছোটগল্পও রচনা করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। প্রথম কবিতার বই ‘পশারিনী’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। তিনি কেবল কবিতাই লিখতেন না, ‘শান্তি’, ‘দীপক’ ও ‘সবুজ বাংলা’ প্রভৃতি পত্রিকায় তার বেশ কয়েকটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছিল।
মাহমুদা খাতুন ছিলেন শান্তশিষ্ট। কিন্তু ভেতরে ছিলেন দ্রোহী। সমাজে প্রচলিত নারীর অবরোধ প্রথা মেনে নেননি। অল্প বয়সেই বেরিয়ে আসেন চার দেয়াল থেকে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল ভালো সম্পর্ক। কবিগুরু তাঁকে বলেছিলেন ‘তোমরা যে পর্দা থেকে বাইরে এসেছ এই আমি আশ্চর্য হয়েছি। দ্যাখো সূর্যের কিরণ না পেলে যেমন গাছপালা বড় হয় না, ফল-ফুল ভালো দেয় না, মানুষও তেমনি বাইরের আলো-বাতাস ছাড়া পূর্ণ হতে পারে না। পদ্ম পঙ্ক থেকে ঊর্ধে- উঠেই সূর্যের কিরণ লাভ করে, না হলে সে লাভ করতে পারত না। আর এখানেই তার সার্থকতা।’
নজরুল ইসলামের সঙ্গে মাহমুদা খাতুনের যোগাযোগ ছিল বেশ। এই বিদ্রোহী কবির আশীর্বাদ ও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন সমানতালে।
ষাটের দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও খ্যাতিমান মহিলা কবি। স্বাধীনতার পরে তিনি আড়ালে চলে যান। সমাদর ছিল না বলে জীবনের শেষ আট-দশ বছর সভা-সমাবেশে আসতেন না। ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমি তাকে সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার একুশে পদকে ভূষিত করে। ৭১ বছর বয়সে এই কবি ১৯৭৭ সালের ২ মে পরলোকগমন করেন।
আনন্দবাজার/শহক









