সংস্কার জরুরি
বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য ও স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঘড়িয়ালডাঙ্গা রাজমন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ। ২০০ বছর আগের পুরনো এ রাজমন্দিরটির অবস্থান কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাবখাঁ গ্রামে। এটি নির্মাণ করেন তৎকালীন জমিদার শরৎচন্দ্র চৌধুরী।
একসময় বছরজুড়ে দুর্গোৎসব, লক্ষ্মী, বাসন্তী, গনেশ, কার্তিক, সরস্বতী, কালী, শিতলী, শীব পূজা, রথযাত্রা, উল্টোরথসহ নানা পূজা অর্চনা এবং ধর্মীয় উৎসবে মুখরিত থাকত মন্দিরটি। সকাল-সন্ধ্যা বাজত শঙ্খ ধ্বনি। মন্দিরে জমিদারবাড়ীর নারীরা দলবেঁধে পূজা করত। দূরদূরান্তের পূজারিরাও এসে এতে অংশ নিতেন।
জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পরেও অনেকদিন চলেছিলো পূজা-অর্চনা। কিন্তু স্বাধীনতার আগে জমিদারের উত্তরসূরিরা স্বপরিবারে ভারতে পাড়ি জমান। এতে করে বন্ধ হয়ে যায় মন্দিরের সব ধর্মীয় কর্মযজ্ঞ।
জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে তৎকালীন জমিদার শরৎচন্দ্র চৌধুরী তার প্রাসাদের সন্নিকটেই ইট ও সুরকি দিয়ে এটি নির্মাণ করেন। ১০০ ফুট গোলাকার ও ৫০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট নিখুঁত গাঁথুনি দ্বারা তৈরি মন্দিরটির নির্মাণশৈলীতে রয়েছে রাজ ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন। যা দর্শনার্থীদের ব্যাপক মন কাড়ে। আট দরজা বিশিষ্ট মন্দিরের ভেতর ও বাইরে অপরূপ কারুকার্যে গড়া পুরো অবকাঠামোটিই এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
একসময় এ মন্দিরের উচ্চ শিখর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের শহর-গ্রামও দেখা যেত বলে জানায় এলাকাবাসী। কথিত রয়েছে, মন্দিরের মাথায় একটি মূল্যবান কষ্টিপাথর ও ভেতরে মূল্যবান সামগ্রী ছিল। যা কয়েক বছর আগে রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যায়। রাজ প্রাসাদের শেষ চিহ্নটুকুও এখন আর অবশিষ্ট নেই। রাজমন্দিরটির দ্রুত সংস্কার ও এর স্মৃতি চিহ্ন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে সংরক্ষণ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সহ স্থানীয়দের প্রাণের দাবী।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নবীন চন্দ্র সরকার বলেন, মন্দিরটি জমিদারী আমলে নির্মিত। আমি জন্মের পর থেকেই মন্দিরটি অবহেলিত অবস্থায় দেখে আসছি। আমি আমার বাপ-দাদার কাছে শুনেছি ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্তের সময় মন্দিরটি নির্মাণকারী জমিদার ভারতে চলে যান। উনার যাওয়ার পর থেকেই অবহেলিত মন্দিরটি এখন ভগ্নাদশায় পড়ে আছে। মন্দিরটির সংস্কার হলে এখানে দর্শনার্থীর ব্যাপক সমাগম ঘটবে। মন্দিরটি কেন্দ্র করেই স্থানীয় কিছু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আমি মন্দিরটি সংস্কারের জোর দাবী জানাচ্ছি।
ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নাথ কর্মকার বলেন, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় জমিদার শরৎচন্দ্র রায় চৌধুরীর নির্মিত রাজ মন্দিরটি অতীত ঐতিহ্য ও স্মৃতি চিহ্ন হয়ে ভগ্নাদশায় দাঁড়িয়ে আছে। এটি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের নয়, এটি কুড়িগ্রাম জেলার ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা অতীব জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আমি ২০১৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে আবেদন দিয়েছিলাম মন্দিরটির সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য। একাধিকবার অবগত করেছি তাদেরকে। এডিশনাল কমিশনার মহোদয়কেও বিষয়টি জানিয়েছিলাম। এছাড়া জেলা প্রশাসক মহোদয়কেও অবগত করেছি। ইউএনও সাহেবকেও বরাবর বলে আসছি মন্দিরটির সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য।
এবিষয়ে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুরে তাসনিম বলেন, মন্দিরটি সংস্কারের জন্য সরকারীভাবে কোন উদ্যোগ নেই। জনপ্রতিনিধিদের কেউ মন্দিরটি সংস্কার করলে মন্দিরের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে। তবে আমি মন্দিরটির সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য এর নাম প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে পাঠাবো।
আনন্দবাজার/এম.আর









