ইতোমধ্যে ঢুকেছে একটি পরিবার, জানে না বিজিবি
- মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা
মিয়ানমার সীমান্তে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে ঢুকে পড়েছে তিন পরিবারের নারী, শিশুসহ ১৫/২০ জন রোহিঙ্গা। তাদের ঠাঁই হয়নি ক্যাম্পে। এরা কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে জানে না প্রশাসন। ৮ এবিপিএন এর অধিনায়ক এডিশনাল ডিআইজি আমীর জাফর জানান, একটি রোহিঙ্গা পরিবারের ৬ জনের একটি টিম ঢুকেছে এমন খবর তাঁর কাছে ছিল। তবে ক্যাম্পে তাদের জায়গা হয়নি। এরা এখন কোথায় আছে জানা নেই।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বাংলাদেশকে ক্রমাগত উসকানি দিয়ে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে দেশের জান্তা সরকার ক্রমক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাকে আবারও পোক্ত করতে চাচ্ছেন। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন মিয়ানমার সেনাবাহিনী গায়ে পড়ে ঝগড়া খুজঁছেন।
বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয়, নেপিদোয় বাংলাদেশ দূতাবাস ও ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে দেশটির সামরিক জান্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। এরই মধ্যে চরম অর্থনৈতিক সংকটে অভ্যন্তরীণভাবেও বেশ বেকায়দায় পড়েছে সেনা সরকার। আর এ কারণে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে একটি যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছে তারা। নানা সমীকরণে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেই সবচেয়ে উপযুক্ত যুদ্ধক্ষেত্র বলে মনে করছে দেশটির ফৌজি সরকার।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) আতিকুর রহমান বলছেন, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জেরে দেশটিতে ডলারের মূল্য বেড়ে যায়। সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দেশটিতে পণ্যমূল্য হয় আকাশচুম্বী। এতে ফুঁসে উঠেছে দেশটির সাধারণ মানুষ। এ পরিস্থিতিতে তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে যে কোনো উপায়ে অভ্যন্তরীণ বড় সংঘাত বা অন্য দেশের সঙ্গে একটি যুদ্ধ চাচ্ছে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন জান্তা। এরই মধ্যে দেশটিতে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, যাতে শত শত সেনা নিহত হয়েছে।
মিয়ানমারের সীমান্ত প্রতিবেশী রয়েছে পাঁচটি দেশ। এগুলো হলো-চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, লাওস ও বাংলাদেশ। চীন জান্তা সরকারের অন্যতম বন্ধু; তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই বিবাদে জড়াবে না দেশটি। মিয়ানমারের মতোই লাওস ও থাইল্যান্ড বৌদ্ধপ্রধান। ফলে তাদের সঙ্গেও কোনো বিরোধ চায় না। বৃহৎ শক্তি ভারতের বিরুদ্ধেও কোনো শক্ত মনোভাব নেই দেশটির বেশিরভাগ জনগণের। ফলে ভারতের সঙ্গেও যুদ্ধে জড়িয়ে লাভ নেই মিয়ানমারের। বাকি থাকে শুধু বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের মধ্যে মুসলিমবিরোধী কঠোর মনোভাব রয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি। বাংলাদেশিরা তাদের দেশে বহিরাগত। ফলে সেখানে বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী কার্ড খেলতে চাচ্ছে জান্তা সরকার। এখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে সক্ষম হলে জান্তা সরকার সাধারণ মানুষকে বোঝাবে- এ মুহূর্তে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় থাকা খুবই প্রয়োজন। আর এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশকে ক্রমাগত উসকানি দিচ্ছে মিয়ানমার।
উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে সহযোগী ছিল সেনাদের। তবে এ মুহূর্তে সমর্থন একেবারেই তলানিতে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বৌদ্ধদেরও অসন্তোষ বেড়েছে। কারণ, জান্তা সরকার দেশটির জনগণকে স্বাভাবিক জীবন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কার্যত ব্যর্থ রাষ্ট্রের পথে মিয়ানমার। করোনা মহামারি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি মিয়ানমারকে বেশ ভালোভাবেই সংকটে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে মূল্যস্ম্ফীতি ও বেকারত্ব ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দারিদ্র্য ৪২ শতাংশের ওপর ঠেকেছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে মাদক উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জান্তা সরকার মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর খরচ মেটাতে চাচ্ছে।
ঢাকায় কর্মরত পশ্চিমা একটি দেশের দূতাবাসের এক কর্মকর্তারা বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত মিয়ানমারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। মিয়ানমারে থাকা মিশন থেকে আমাদের হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হচ্ছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বরাবরই অভিযোগ করে আসছে, বাংলাদেশের ভেতর থেকে বিদ্রোহীরা মিয়ানমারে গিয়ে সহিংসতা করে আবার বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। অথচ পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত।
মিয়ানমারের এ ধরনের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অভিযোগ করে আসছে। তবে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার- অন্য কোনো দেশের সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের জন্য বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এ বার্তাই তাদের একাধিকবার দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও তাদের অভিযোগের পর সীমান্তে বাংলাদেশের নজরদারি ও পাহারাও জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশে মর্টার শেল ও গোলাবারুদ পড়ার পর গত ২২ দিনে তিনবার মিয়ানমার রাষ্ট্র দূতকে ডেকে সতর্ক কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঢাকা।তা সত্ত্বেও ক্রমাগত আকাশ সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছে দেশটি। একাধিক বার সতর্ক করার পরও বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না মায়ানমার জান্তা সরকার। শুরুতে নিছক দুর্ঘটনা হিসাবে দেখলেও এখন সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। গত ১০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেশের নিরাপত্তার জন্য অবশ্য হুমকি।
সাবেক রাষ্ট্র দূত হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমারের জান্তা সরকার অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। সে দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণ এখন সামরিক সরকার চায় না। এ জন্য জান্তা সরকার পরিকল্পিতভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। কারণ মিয়ানমারে চলছে এখন গৃহযুদ্ধ। তাই এ সময় বাংলাদেশকে সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কোনোমতেই সমীচীন হবে না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সারাবিশ্বের নৈতিক সমর্থন পাচ্ছে। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সেই আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহানুভূতি হারাতে পারে বাংলাদেশ। তাই ধীরে সুস্থে আগাতে হবে বাংলাদেশকে।
এমনটা মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, প্রয়োজনে চীন ভারতের মাধ্যমে বহুপাক্ষিক বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ পথে হাঁটতে হবে আমাদের। তবে মায়ানমার সরকার তাদের মনোভাব পরিবর্তন না করলে বাংলাদেশকেও পাল্টা জবাব দেবার সক্ষমতা দেখিয়ে যেতে হবে সীমান্তে।
কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক মেহেদী হাসান বলেন, সীমান্তের সবকটি পয়েন্টে সৈন্য সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন বিজিবি। কোন রোহিঙ্গাকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
এদিকে, উখিয়ার পালংখালী আনজুন পাড়ার বিজিবি ক্যাম্প, বালুখালীক্যাম্প ও ঘুমঘুম সীমান্ত ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তে যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। বর্তমানে উত্তেজনা থাকলেও পরিস্থিতি রয়েছে বিজিবির অনুকূলে। এমনটাই দাবি বিজিবি কর্তৃপক্ষের। তারা অবশ্য নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।









