সম্প্রতি ঢাকার পোস্তগোলা সংলগ্ন শ্যামবাজার এলাকায় মর্নিং বার্ড নামে একটি লঞ্চডুবির ঘটনার পর বাংলাদেশে নৌপথে নিরাপত্তা দুর্ঘটনার বিষয়টি আবারো সামনে চলে এসেছে। সোমবার (২৯ জুন) সেই লঞ্চ দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হন।
যান চালনায় অনিয়ম এবং অদক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে লঞ্চ বা ফেরি পরিচালনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্য পরিবহনের সাথে প্রতিযোগিতায় এবং যান্ত্রিক ত্রুটি এমন নানা কারণে নৌপথে বড় বড় দুর্ঘটনাও ঘটে।
বেসরকারি সংস্থা কোস্ট বিডির গবেষণা অনুসারে, গত ২০ বছরে বাংলাদেশের নৌপথে ১২টি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন।
সংস্থাটির একজন যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মুজিবুল হক মুনির জানিয়েছেন, লঞ্চডুবির বড় ঘটনার মধ্যে অনেকগুলোই ঘটেছে মেঘনা নদীতে।
প্রাণহানির হিসাব অনুযায়ী দেশের নৌপথে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার কয়েকটি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক। বাংলাদেশের নৌযান কর্তৃপক্ষ, নৌনিরাপত্তা এবং যাত্রী পরিবহন নিয়ে কাজ করেন এমন সংস্থার সাথে কথা বলে এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
পিনাক-৬ ২০১৪ সালের ৪ঠা অগাস্ট আড়াইশো'র অধিক যাত্রী নিয়ে পদ্মা নদীতে নিমজ্জিত হয় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ।
বাংলাদেশের নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, ওই লঞ্চটি পরে আর তোলা সম্ভব হয়নি, এবং এর ধ্বংসাবশেষও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
যেখানে ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, আর ৫০ জন যাত্রীর খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। বাকীরা সাঁতরে এবং জেলেদের সহায়তায় তীরে উঠতে পেরেছিলেন।
[caption id="attachment_48535" align="aligncenter" width="410"]
স্বজনের খোঁজে নদী তীরে অপেক্ষা।[/caption]
এমভি নাসরিন-১ ২০০৩ সালের ৮ই জুলাই ঢাকা থেকে ভোলার লালমোহনগামী এমভি নাসরিন-১ নামের লঞ্চটি চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর ত্রি-মোহনায় ডুবে যায়।
বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, অতিরিক্ত যাত্রী ও অধিক মালবোঝাইয়ের কারণে লঞ্চটির তলা ফেটে গিয়েছিল।
ডুবে যাওয়ার সময় লঞ্চটিতে কতজন যাত্রী ছিলেন সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তবে ওই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে প্রায় সাড়ে ছয়শো মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর হিসাবে এই লঞ্চডুবিকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা বলা হয়।
[caption id="attachment_48536" align="aligncenter" width="976"]
২০১৪ সালে ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ এর উদ্ধারকাজ।[/caption]
এমভি সালাউদ্দিন-২ ২০০২ সালের ৩রা মে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ডুবে যায় সালাহউদ্দিন-২ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ।
এতে ভোলা এবং পটুয়াখালীগামী প্রায় চারশো যাত্রী মারা গিয়েছিলেন।
ওই দুর্ঘটনার পর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের করা একটি তদন্ত কমিটি নকশামতো লঞ্চ নির্মাণ না করায় মালিককে এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহনের দায়ে মাস্টারকে অভিযুক্ত করে।
ফলে ওই লঞ্চের মালিককে জরিমানা এবং মাস্টারকে চাকরীচ্যুত করা হলেও অন্যদের শাস্তি হয়নি।
এমভি রাজহংসী ২০০০ সালের ২৯শে ডিসেম্বর ঈদুল আজহার রাতে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল এলাকায় মেঘনা নদীতে এমভি জলকপোত এবং এমভি রাজহংসী নামের দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
এর ফলে রাজহংসী লঞ্চটি একেবারে পানিতে তলিয়ে যায়, সে সময় ওই লঞ্চের ১৬২ জন যাত্রী নিহত হয়েছিলেন।
অ্যাটলাস স্টার ১৯৮৬ সালে অ্যাটলাস স্টার নামে একটি লঞ্চ ডুবে ২০০ জন যাত্রী মারা গিয়েছিলেন।
লঞ্চটি ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক যাত্রী পরিবহন এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে ডুবে গিয়েছিল বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
[caption id="attachment_48537" align="aligncenter" width="976"]
২০০৯ সালে ভোলার কাছে ডুবে যায় এমভি কোকো-৪ লঞ্চ।[/caption]
এছাড়াও ২০০৫ সালে একটি ফেরী ডুবে গিয়ে ১১৮জন যাত্রী নিহত হন, এবং ২০০৫ সালে এমএল মিতালি ও এমএল মজলিশ নামে দুইটি ছোট লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষের পর ডুবে গিয়ে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছিল।
কোস্ট বিডির মি. হক জানিয়েছিলেন, ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত নৌদুর্ঘটনার জন্য দেশে পাঁচশো'র বেশি মামলা এখনো চলছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র একটি মামলার বিচার হবার নজির রয়েছে।
আনন্দবাজার/শাহী








