- প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা: পিবিআই
নরসিংদীর বেলাবতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই নরসিংদী। স্ত্রীর নামে করা ঋণের চাপ থেকে মুক্তি, জুয়ার টাকা না থাকা ও প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই দুই সন্তানসহ স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন স্বামী। শনিবার গভীর রাতে ছুরিকাঘাত ও ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে স্ত্রী সন্তান হত্যার পর পালিয়ে যান তিনি। হত্যার পর সকালে স্ত্রী সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে বাড়ি ফিরে প্রতিপক্ষের ওপর হত্যার দায় চাপানোর চেষ্টা করেন স্বামী গিয়াস উদ্দিন শেখ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নরসিংদী পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এমন তথ্য জানান পিবিআই নরসিংদীর পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, হত্যাকান্ডের পর পিবিআই এর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্ত্রী সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেন আটক স্বামী গিয়াস উদ্দিন শেখ। পরে সোমবার বিকালে নরসিংদীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রকিবুল হকের আদালতে মামলার একমাত্র আসামী হিসেবে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় এই লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের জবানবন্দি দেন স্বামী।
আসামীর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানান, তার জবানবন্দীতে জানা যায় তিনি একজন দীর্ঘদিনের জুয়া খেলার আসক্ত জুয়ারী এবং খারাপ লোকজনদের সাথে তার চলাফেরা রয়েছে। জুয়া খেলার বিষয়ে নানা অজুহাতে তার স্ত্রী রহিমা, শ্বশুর, শ্যালক সহ শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের মাধ্যমে বিভিন্ন সমিতি, আশা, ব্র্যাক, ঠেঙ্গামারা এনজিও সহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ১০লাখ টাকা সুদে নিয়ে জুয়ায় খরচ করে। ঐ সকল ধার দেনার সপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তির প্রয়োজনে প্রতি মাসে প্রায় ২২-২৩ হাজার টাকা দরকার হয়। কিন্তু তার আয় কম। সেই কারণে নানাভাবে টাকার চাঁপে পড়েন। টাকা না থাকলে জুয়া খেলতে না পারায় তার মাথা ঠিক থাকে না।
তিনি আরো জানান, প্রায় দুই বছর পূর্বে তার আপন চাচাতো ভাই রেনু শেখ বাড়ির পাশে পুকুর খনন করার সময় গিয়াস উদ্দিনের কাছে ৪ হাত জায়গা চায়। গিয়াস উদ্দিন জায়গা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চাচাতো ভাই রেনু শেখ তার বাড়ীতে প্রবেশের রাস্তা গিয়াস উদ্দিন শেখ ও তার পরিবারকে ব্যবহারে বাধা প্রদান করে। অনুমানিক ১৫ দিন আগে অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিন টাকার অভাবে ২টি আকাশি গাছ বিক্রি করে। কিন্তু তার চাচাতো ভাই রেনু শেখ তাদের বাড়ির পথে গাছ নিতে বাধা প্রদান করে। এই বিষয়ে ঝগড়া বিবাদ হয়। ফলে অভিযুক্ত তার চাচাতো ভাই রেনু শেখ ও তাদের পরিবারের প্রতি ক্ষুব্ধ হয় এবং তাদের পরিবারের লোকজনদের শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করে।
অন্যদিকে গিয়াস উদ্দিনের ভাষ্যমতে, তার স্ত্রী মারা গেলে তার স্ত্রীর নামে নেওয়া ও তার শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের মাধ্যমে সুদে ও ধারে নেওয়া টাকা পরিশোধ করতে হবে না সেই সাথে পূর্ব শত্রুতা ও ঝগড়ার দায়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যাবে। তাই শনিবার রাতে তার স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাত অনুমান সাড়ে ৮টার দিকে গিয়াস উদ্দিন তার সন্তানদের সহ রাতের খাবার খেয়ে সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দেন। স্ত্রী সহ পাশের ঘরে ঘুমাবে বলে স্ত্রীকে দরজা খুলা রেখে ঘুমাতে বলে। ওইদিন দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ছেলের ক্রিকেট খেলার ব্যাট এবং ঘরে থাকা ছুরি নিয়ে স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করে মশারী খুলে ঘুমন্ত অবস্থায় রহিমা বেগমের মাথায় ব্যাট দিয়ে স্বজোরে উপর্যুপরি আঘাত করেন এবং ব্যাট দিয়ে গলায় চেঁপে ধরেন। ভিকটিম রহিমা বেগমকে বিছানা থেকে ঘরের মেঝেতে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য ছুরি দিয়ে পেটে সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। পরবর্তীতে অভিযুক্ত চিন্তা করেন যে, সে বাড়িতে ছিল বিষয়টি সন্তানরা বলে দিতে পারে ভেবে সন্তানদেরও মেরে ফেলার স্বীদ্ধান্ত নেয়। পরে সন্তানদের ঘরে গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রথমে ছেলে রাব্বি শেখ ও পরে মেয়ে রাকিবা এর মাথায় ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে উপর্যুপরিভাবে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিন বাড়ির পিছন দিকে গঙ্গাজরি নদীতে ছুরি ফেলে নদী পাড় হয়ে নিকটবর্তী ডেভলারটেক নামক স্থানে ঝুপের মাঝে হত্যায় ব্যবহৃত ক্রিকেট খেলার ব্যাটটি লুকিয়ে রেখে ফজরের আযান পর্যন্ত অপেক্ষা করে। আযানের পরে পায়ে হেটে ভূইয়া বাজারে যায়। ভূইয়া বাজার থেকে সিএনজি করে গাজীপুরের কাপাসিয়া থানার আড়াল নামক স্থানে তার কর্মস্থলে চলে যায়। গিয়াস উদ্দিনের ছোট ভাই রিয়াজ সকাল পৌনে ৭টার দিকে তার ভাবী ও সন্তানদের কে বা কাহারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে জানালে গিয়াস উদ্দিন পুনরায় সিএনজি যোগে বাড়িতে এসে ঘটনার বিষয়ে কোন কিছু না জানার অভিনয় করতে থাকে। সে প্রকাশ করতে থাকে যে, ঘটনার সময় সে বাড়িতে ছিল না এবং ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানে না এবং তাদের বাড়ির জমি, রাস্তা ও গাছ কাটা নিয়ে তার শত্রু পক্ষ চাচাতো ভাই রেনু ও তার পরিবার এই হত্যাকান্ড ঘটাতে পারে মর্মে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং ন্যায় বিচার দাবী করেন। পরে ঘটনার সম্ভাব্য সময় গিয়াস উদ্দিন সহ তাদের অবস্থান এবং তাদের স্বাভাবচরিত্র, আচরণ, পূর্ববর্তী রেকর্ড (পিসিপিআর) সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া হয় ও গিয়াস উদ্দিনের প্রতিটি বক্তব্যের সত্যতা যাচাই বাছাই করা হয়। একপর্যায়ে গিয়াস উদ্দিনের বক্তব্যে মিথ্যা তথ্য ও আচরণ অস্বাভাবিক পরিলক্ষিত হলে তার প্রতি সন্দেহের তীর ঘনিভূত হয়। এছাড়া তার অন্য মেয়ের সাথে পরকিয়ার বিষয়টিও নজরে আসে। ফলে তাকে সন্দেহের শীর্ষে রেখে পিবিআই হেফাজতে তার বক্তব্যের অসংগতি উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হলে উক্ত গিয়াস উদ্দিন নিজেই তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করে।
পিবিআই পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান আরো বলেন, মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পরকীয়া প্রেম, ঋণের বিষয়, শত্রুতা ও অন্যকারো সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলি যাচাই করে দেখা হবে।
এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় রবিবার রাতে বেলাব থানায় অজ্ঞাত আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন নিহত রহিমা বেগমের ভাই মোশাররফ হোসেন। ওই মামলায় গিয়াস উদ্দিন শেখকে একমাত্র আসামী করা হয়েছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী শেষে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন। এই হত্যা মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআই এর নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।









