ঈদের অর্থ আনন্দ বা খুশি । কিন্তু এবারের ঈদের চিত্র হয়েছে উল্টো। প্রিয়জনদের সঙ্গে এ আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ। এখন চলছে কর্মস্থলে ফেরার পালা। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রা হয়েছে মর্মান্তিক। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, ঈদের আগে-পরে ১৩ দিনে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ৯ শতাধিক। এদিকে গতকাল শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুসহ পাঁচজন নিহত হন। তারা সবাই এক পরিবারের বলে ধারণা পুলিশের।
ঈদের ফিরতি যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। সড়কে এ মৃত্যুর মিছিল গত বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে সমন্বিত এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারায় এমন প্রাণহানি ঘটছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে অব্যবস্থাপনার কারণে এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে কেবল ছুটি বৃদ্ধি নয়, ব্যবস্থাপনা ঠিক করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া মহাসড়কে যানজট ও ভাড়ার নৈরাজ্য মোকাবিলায় নতুন সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঈদযাত্রায় গত ১৪ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ১৩ দিনে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩০৯ জন নিহত এবং ৯০২ জন আহত হন। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, গত ১৭ থেকে ২৬ মার্চ রাত ৮টা পর্যন্ত সারা দেশে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩৪২টি। এতে নিহত হয়েছেন ২৭৯ জন আর দুই হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।
উভয় সংগঠন বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা, হতাহতের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী, যা ফিরতি যাত্রা শেষ হলে গত বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। রোড সেফটির হিসাবে ঈদযাত্রায় ২০২২ সালে ৪৪৩ জন, ২০২৩ সালে ৩২৮ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৩২২ জন নিহত হয়েছেন। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ঈদযাত্রায় ২০২২ সালে ৪৪৩ জন, ২০২৩ সালে ৩২৮ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৮ জন, ২০২৫ সালে ১৫ দিনে ৩৫২ জন নিহত হন।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এ বছর ঈদযাত্রা শুরু হয় গত ১৩ মার্চ থেকে। প্রথমদিকে ঘরমুখো মানুষের চাপ কম থাকায় সড়ক, রেল ও নৌপথের যাত্রায় স্বস্তি থাকলেও শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। ১৫ মার্চ থেকে টানা সাতদিনের সরকারি ছুটি শুরু হলে ঘরমুখী যাত্রীর ঢল নামে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মৃত্যুর মিছিলও। এর মধ্যে ৯ জেলায় একদিনে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন প্রাণ হারায়। ২৩ মার্চ সরকারি ছুটি শেষ হলেও থামেনি মৃত্যুর মিছিল, বরং হু হু করে বেড়েছে। সাধারণত ফিরতি যাত্রায় দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বাড়লেও এবার সে হার বেশি। বৃহস্পতিবার স্বাধীনতা দিবসের সরকারি ছুটির পাশাপাশি পরের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় অনেকে এখনো ঢাকায় ফেরেননি। আবার বাড়তি ছুটির কারণে অনেকে ঢাকা ছেড়েছেন। আজ শনিবার থেকে তারা ফিরতে শুরু করবেন। ফলে এবারের ঈদযাত্রায় মৃত্যুর মিছিল আরো বাড়বে।
এবারের ঈদযাত্রায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যাও সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় বেশি লক্ষ করা গেছে। ১৮ মার্চ বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার এলাকায় নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে অন্তত ৬৫ জন আহত হন। এতে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ প্রায় ২১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। একই দিন সদরঘাটে ঢাকা-ইলিশা রুটের ‘আসা যাওয়া-৫’ লঞ্চে ট্রলার দিয়ে যাত্রী তোলার সময় পেছন থেকে ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’ নামে আরেকটি লঞ্চ সজোরে ধাক্কা দিলে দুই লঞ্চের মাঝে পিষ্ট হয়ে দুজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
ঈদের দিন মধ্যরাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের লেভেল ক্রসিংয়ে ঢাকাগামী চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনের সঙ্গে ‘মামুন স্পেশাল’ নামের একটি বাসের সংঘর্ষে ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। গত বুধবার দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন এবং কুমিল্লায় পেছন থেকে আসা বাসের ধাক্কায় প্রাইভেট কারে থাকা এক পরিবারের চারজনসহ পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
নতুন সরকারের সড়ক পরিবহন, সেতু, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবারও ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকারি ছুটি বাড়িয়ে সাতদিন করা হয়েছে। কিন্তু গতবারের চেয়ে এবার দুর্ঘটনা ও হতাহতের হার ঊর্ধ্বমুখী এবং বাড়তি ভাড়া, যানজটে ভোগান্তির পরও ঈদযাত্রা স্বস্তির হয়েছে বলে দাবি করছেন মন্ত্রীরা।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল ছুটি বাড়িয়েই ঈদযাত্রার মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না। সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা রাজধানীকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যানবাহনের অব্যবস্থাপনায় ঈদের সময় মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল দেখা যায়। এ সময়ে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঘরমুখো হওয়ায় যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা না বাড়ায় দূরপাল্লার বাহনের অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়া, বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, ঈদযাত্রায় সব ধরনের গণপরিবহনে সমন্বয়ের অভাব, সড়ক-রেল-নৌপথে কার্যকর মনিটরিংয়ের অপ্রতুলতা ডেকে আনছে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু। ফলে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করা না হলে ঈদযাত্রায় আনন্দের বদলে শোক সইতে হবে।
ফলে সংকটগুলো ধীরে ধীরে আরো বাড়ছে, দুর্ঘটনা আরো বাড়তেই থাকবে—এটাই স্বাভাবিক।









