দেশজুড়ে একের পর এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। মাত্র ১০ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে, যা অনেকের কাছেই এক আতঙ্কজনক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
শোকের ছায়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
এই ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজন আত্মহত্যা করেছেন, নয়জন সড়ক ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এবং চারজন মারা গেছেন বিভিন্ন অসুস্থতায়। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন মেডিকেল শিক্ষার্থী, বাকিরা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—৩ এপ্রিল, একদিনেই একাধিক শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটে। একই দিনে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় প্রাণ হারান চার শিক্ষার্থী, যা এই ট্র্যাজেডিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও আত্মহত্যা—মৃত্যুর বহুমুখী কারণ
রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আনিসা শারমিলা নাফিসা সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্যদিকে কুমিল্লার সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিন অভিমানে ১০৯টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন—যা সহপাঠীদের নাড়িয়ে দিয়েছে গভীরভাবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আসিফ আসমাত নিবিড় দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে মারা যান। ময়মনসিংহে ছাদ থেকে পড়ে প্রাণ হারান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা রিজু।
একইভাবে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দীপা দাস দাম্পত্য কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন। সাতক্ষীরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সজীব দত্তও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
পদ্মার বুকে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ছিলেন চারজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এবং বিইউএফটির শিক্ষার্থীরা ছিলেন।
সড়ক দুর্ঘটনা ও আকস্মিক মৃত্যু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান ইমন গাজীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মৌমিতা হালদার প্রাইভেটকারের ধাক্কায় প্রাণ হারান।
হাবিপ্রবির শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম খায়রুল আকস্মিকভাবে মারা যান। আবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ অসুস্থতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন।
রাজধানীতেও একের পর এক মৃত্যু
ঢাকার ভাটারা এলাকায় আনিপা নিন্দিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হাজারীবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সীমান্ত বিষাক্ত দ্রব্য পানে আত্মহত্যা করেন। উত্তরায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাবিত মাহমুদ শাওনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অসুস্থতায় প্রাণহানি
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাবরী মাহি ডায়রিয়াজনিত জটিলতায় মারা যান।
বাড়ছে উদ্বেগ, উঠছে প্রশ্ন
এক মাসেরও কম সময়ে এত সংখ্যক শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু শোকই নয়, উদ্বেগও বাড়িয়েছে বহুগুণে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাস পরিবেশ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সহপাঠী, বন্ধু ও স্বজনদের কাছে তারা ছিলেন স্বপ্নবাজ, প্রাণবন্ত মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই লিখছেন—“এত দ্রুত হারিয়ে যাবে, ভাবিনি।”
এই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনাগুলো যেন এক অদৃশ্য সংকেত—যা আমাদের বাধ্য করছে নতুন করে ভাবতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।









