ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বহুল আলোচিত বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তিটি গোপনীয়তার আড়ালে সম্পন্ন হওয়ায় শুরু থেকেই এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই পুরো চুক্তি প্রকাশ করলে এর বিভিন্ন শর্ত নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ এই চুক্তিকে ‘অসম’ এবং ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য উন্মুক্ত বাজারে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে দেশীয় শিল্প ও কৃষিখাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক সমাবেশে বলেছেন, এই চুক্তি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারে। তিনি সংসদে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে চুক্তি বাতিলের দাবি জানান।
একই সুরে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন, এই চুক্তি জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির চেয়েও বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিয়েছে, যেখানে বিপরীতে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে সুবিধা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সুবিধার বাস্তব ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত গত বছর এসব পণ্যের মধ্যে মাত্র ১৪টি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাস করে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা দেশের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এতে সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতি দাঁড়াতে পারে শত শত কোটি টাকায়।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বা ডিজিটাল চুক্তি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
এছাড়া জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও খনিজ সম্পদ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ এলএনজি, কৃষিপণ্য এবং সামরিক সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।









