* বাল্যবিয়ে আর শিশুশ্রমে ঝরে পড়ারা ক্লাসে ফেরেনি * ঝরে পড়াদের ফেরাতে নানা উদ্যোগ
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিধ্বস্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। পৌনে দুই বছর ধরে বন্ধ ছিলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম। এতে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের বাল্যবিয়ে আর দরিদ্র পরিবারের ছাত্ররা শিশুশ্রমে আটকে পড়ায় এখনও ক্লাসে ফেরেনি অনেক শিক্ষার্থী। এর ফলে শুধু টাঙ্গাইল জেলার মাধ্যমিক স্তরেই ঝরে পড়েছে প্রায় সাড়ে দশ হাজার শিক্ষার্থী।
তথ্যটি নিশ্চিত করেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম। অধ্যয়নরত এসব শিক্ষার্থীরা করোনায় প্রায় পৌনে দুই বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর এসব শিক্ষার্থীদের হদিস মিলছে না।
জেলা শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৫ মার্চ জেলায় মোট অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৬৫৭ জন। স্কুল খোলার পর ক্লাসে ফিরেছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ২২১ জন শিক্ষার্থী। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হুগড়া ইউনিয়নের হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয়ে দেড় হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৯০ জন করোনার দীর্ঘ ছুটি শেষে স্কুলে ফিরেছে। বাকি ছাত্র-ছাত্রী অনুপস্থিত। পরে শিক্ষকেরা জানতে পারেন, এসব অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬০ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। এ ছাড়া ৩০ জন ছাত্র দারিদ্রের কারণে বিভিন্ন জায়গায় কাজ নিয়েছে। তাই তারা স্কুলে ফেরেনি। আর বাকিদের বিষয়টি তাঁরা জানতে পারেননি। শুধু হাবিব কাদের উচ্চ বিদ্যালয় নয়, করোনার পর টাঙ্গাইল জেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭৩৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার ৪৩৬ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে ফেরেনি। তাদের স্কুলে ফেরাতে চলছে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এদিকে জেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অসন্তোষজনক হলেও প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ জানান, করোনার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি সন্তোষজনক। গড়ে শতকরা ৯২ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী করোনার ছুটি শেষে ক্লাসে ফিরেছে।
সরেজমিন একাধিক উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ক্লাসে না আসা অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়েছে। অনেক ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। অনেক ছাত্র দারিদ্রের কারণে কাজে ঢুকে গেছে। ঘাটাইলের পাকুটিয়া মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র প্রকাশ চক্রবর্তী। তার বাবা প্রভাস চক্রবর্তী বাবুর্চির কাজ করতেন। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন বন্ধ ছিল, তেমন বন্ধ ছিল প্রকাশের বাবার কাজ। অসচ্ছল সংসারে খরচ জোগাতে সে দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করে। দীর্ঘদিন পর স্কুল খুললেও তার আর স্কুলে ফেরা হয়নি।
বাসাইল উপজেলার বাথুলী সাদী লাইলী বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সালাম খান জানান, শুধু তাদের স্কুলে ৮৮ জন ছাত্রছাত্রী অনুপস্থিত। করোনার ছুটি শেষে এ চিত্র সর্বত্র। তাদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ করা হচ্ছে। ওই স্কুলের হাবিবা ঊর্মি নামের দশম শ্রেণির এক ছাত্রী জানায়, তার অনেক সহপাঠীর বিয়ে হয়ে গেছে। করোনার ছুটি শেষে স্কুল খোলার পর তাদের আর ক্লাসে দেখা যাচ্ছে না।
ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজের প্রাক্তণ শিক্ষক শংকর দাশ জানান, করোনার ছুটি শেষে স্কুল খুলে দেওয়ার পর অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর ক্লাসে ফিরে না আসাটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষক, অভিভাবক এবং সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ঝরে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে হবে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম জানান, তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়ে এ বিষয়ে সভা করা হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী স্কুলে আসছে না, তাদের স্কুলমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আনন্দবাজার/এম,.আর









