বাঁচার লড়াইয়ে হাঁস, মুরগি ছাগল বিক্রি
- তবুও যদি মজুরি বাড়ে
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় চা শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়েই যাচ্ছেন। উপজেলার বিভিন্ন বাগানে চলছে কর্মবিরতি। কুলাউড়ার গাজীপুর, কালিটি, রাঙ্গিছড়া, রাজানগরসহ অন্যান্য বাগানের শ্রমিকরা কাজে ফেরেনি। তারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে কর্মবিরতিতে রয়েছেন। গত ১৫ দিন থেকে মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে চা শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ৩০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এরই মধ্যে গতকাল কুলাউড়ায় নবিন চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় চৌমুহনীতে অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন করেছেন। গতকাল বুধবার সকালে সড়কপথ অবরোধ ও বিকেলে আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেন আটকিয়ে আন্দোলন করেছেন শ্রমিকরা।
চা শ্রমিকরা দীর্ঘ ১৫ দিন থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তৈরি হয়েছে। এসব শ্রমিকরা ১২০ টাকা মজুরিতে বাগানে কাজ করেন। কর্মবিরতির ফলে তাদের পরিবারে চলছে এখন অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। ফলে অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। অনেক শ্রমিক পরিবার এক-দুই বেলা না খেয়ে দিন যাপন করছেন । অনেক পরিবারে আবার অল্প অল্প খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের মজুরি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি তাদের রেশন বন্ধ রেখেছে বাগান কর্তৃপক্ষ। ফলে আন্দোলনের সঙ্গে তাদের দিনযাপন অনেকটা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এই আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে চা শ্রমিকদের জীবন জীবিকায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এখন তাদের লড়াই করে বেঁচে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।
চা শ্রমিক পূরন মহালি ৪ সন্তান নিয়ে তার পরিবার। তার ছেলে-মেয়েসহ কর্মবিরতিতে যোগদান করে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। পূরন মহালি ২ সপ্তাহের মজুরি না পাওয়ায় তার পরিবারের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তার স্ত্রীর ১৫ টি মুরগি বিক্রি করে এখন খাদ্য সামগ্রী ক্রয় করেছেন। ১৫টি মুরগি ৪ হাজার ১ শত ৫০ টাকা বিক্রি করে এখন তাদের পরিবার চলছে। কিন্তু এই অনিশ্চিত আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে কি হতে পারে তাদের কোনো ধারণা নেই।
পূরন মহালি বলেন, 'এখন মুরগি বিক্রি করে দিন যাচ্ছে। আন্দোলন দীর্ঘ হলে কিভাবে পরিবার চলবে বলতে পারছি না’। একইভাবে চা শ্রমিক মদন রায়ের পরিবারের অবস্থা। তিনি ২টি ছাগল বিক্রি করে এখন সংসারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনের কারণে কাজে না যাওয়ায় কয়েক দিন টানাপোড়েনের পর তিনি ছাগল বিক্রি করতে বাধ্য হন। ছাগল বিক্রির টাকা দিয়ে এখন তাদের পরিবার চলছে। মদন রায় জানান, ‘এখন অর্থ অভাবে ছাগল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। কারণ ঘরে খাবারের কিছু ছিল না’।
৭ সন্তানের বাবা চা শ্রমিক জুতি মহাল। এই বড় পরিবার নিয়ে তার এখন আন্দোলন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ঘরে রান্নার পরিমাণ এখন অল্প। পেট ভরে খাওয়া এখন তাদের হয়না। রান্নার উপকরণ কেনা তার জন্য এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুঃসময়ে জুতি মহাল একটি গরু বাছুর বিক্রি করেছেন। কারণ তার পক্ষে এখন অর্থ ছাড়া চলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি ১৩ হাজার টাকায় ১টি গরু বাছুর বিক্রি করেছেন। তা দিয়ে এখন সংসার চলছে। আন্দোলন দীর্ঘ হলে এই টাকা দিয়ে কতদিন চলবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় তার পরিবার।
জুতি মহাল জানান, 'এখন গরু বাছুর বিক্রি করে চলতে পারছি। পরে কি হবে জানিনা। ৩০০ টাকা ছাড়া ঘরে ফিরবো না’। আরেক শ্রমিক উনিল বাউরি। তার ছেলে-মেয়ে ক্ষুধার্ত ছিল। শেষ পর্যন্ত ঘরের ৫টি হাঁস ও ৩টি মুরগি বিক্রি করেছেন। এই বিক্রির টাকা দিয়ে এখন তার সংসার চলছে। অভাবের সংসারে ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে তার পুরো পরিবার এখন আন্দোলন করছে। উনিল বাউরি জানান, 'আমারা আমাদের শেষ রক্ত দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবো। না খেয়ে মরে যাবো তবুও ৩০০ টাকা মজুরি ছাড়া ফিরবো না’।
দেশে চা-বাগানসমূহে শ্রম অসন্তোষ নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান এর সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে রাত নয়টা থেকে গত ২২ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত চা বাগানের শ্রমিক নেতৃবৃন্দের জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে শ্রমিক নেতারা প্রশাসনের সাথে পূর্বের মজুরিতে বাগানে ফেরার জন্য সিদ্ধান্ত নেন এবং লিখিতভাবে যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন।
কিন্তু বর্তমানে সাধারণ চা শ্রমিকরা ৩০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বৈঠকের পর থেকেই সাধারণ শ্রমিকরা ফুঁসে উঠেছেন। তারা মনে করেন যে চা শ্রমিক নেতারা এ সিন্ধান্ত মেনে নিয়েছেন তারা চা শ্রমিক আন্দোলনের কেউ না। তারা শ্রমিকদের সাথে দালালি করে ১২০ টাকা মজুরিতে একাত্মতা পোষণ করেছে। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি ৩০০ টাকা।
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ৩০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন বন্ধ করবেন না। বৈঠকের পর চা শ্রমিকদের কাজে ফিরতে বলা হয়। কিন্তু সাধারণ শ্রমিকরা এরপর থেকে আন্দোলন আরও জোরালো করার ঘোষণা দেন। চা শ্রমিকরা জানিয়েছেন ৩০০ টাকা ছাড়া তারা আন্দোলন বন্ধ করবেন না। তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তারা বৈঠকের সিদ্ধান্ত মানতে অপারগতা প্রকাশ করেন।









