সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের তরুণ অভ্র ফাহিমের স্বপ্ন ছিল উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যাওয়া। পরিবারের সম্মতিতে সেই স্বপ্নপূরণের যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের ইতি টেনে দেয়। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে তারসহ অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপগামী একটি রাবারের নৌকায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ছয় দিন সমুদ্রে ভাসার পর বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে। খাদ্য ও পানির অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। উন্নত জীবনের আশায় তরুণরা ঝুঁকি জেনেও এই বিপজ্জনক পথে যাচ্ছে।
তদন্তে জানা যায়, দালালচক্র উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। এরপর ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। টাকা দিতে না পারলে হত্যা পর্যন্ত করা হয়।
শুধু সাম্প্রতিক ঘটনাই নয়—ভারতে পাচার, লিবিয়ায় হত্যা, রাশিয়ায় যুদ্ধে বাধ্য করা—এমন একাধিক ঘটনায় বাংলাদেশিরা শিকার হচ্ছেন আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের। রোহিঙ্গারাও এই চক্রের বাইরে নয়।
তবে মানবপাচারের মামলার বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। ২০২৪ সালের প্রথম ১০ মাসে ৩৩৬টি মামলার মধ্যে মাত্র ১৯টিতে সাজা হয়েছে, বাকিগুলোতে অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়েছে। ফলে পাচারকারীরা প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চক্র আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন। সচেতনতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই সংকট রোধ সম্ভব নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ পথে বিদেশে গেলে আইনি সহায়তা সীমিত হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে গ্রিসসহ সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিহতদের মরদেহ দেশে আনা এবং জীবিতদের সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিয়ত স্বপ্নের ইউরোপযাত্রা অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। দালালচক্রের প্রতারণা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা এবং সচেতনতার অভাব—সব মিলিয়ে মানবপাচার আজ একটি গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ট্র্যাজেডি থামানো কঠিন হবে।









