সব সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতি মাসে সমন্বয় সভা হলেও হয় না সমন্বয়। একে অন্যকে দোষ দিতেই ব্যস্ত সংস্থাগুলো
বিশ্বের সিংহভাগ উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হয়ে উঠেছে এখন জনশক্তি রফতানি থেকে পাওয়া প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)। যে দেশের রেমিট্যান্স যত বেশি রিজার্ভে সে দেশ ততো ভরপুর, জিডিপির আকার ততোই বড়। গত প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি চাকা প্রচণ্ড গতিশীল করে চলেছে রেমিট্যান্স।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় কোটি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সে শুধু প্রান্তিক পর্যায়েই বদল ঘটায়নি, গোটা দেশকেই বদলে দিয়েছে। জিডিপি যেমন বেড়েছে তেমনি অর্থনীতির আকারও দিন দিন বড় হচ্ছে। মূলত, প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের ওপর ভর করেই অবিশ্বাস্য বদল ঘটছে দেশের।
তবে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশকে বদলে দেয়া কিংবা দেশের মর্যাদা যারা বাড়িয়ে দিয়েছে সেই প্রবাসীরাই পদে পদে অবহেলা আর উপেক্ষার শিকার হয়েছেন। দেশ আর দেশের অর্থনীতির জন্য তাদের অসামান্য অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা বা সম্মান জানানো দূরের কথা চরমভাবে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হতে হয় তাদের। বিবেচিত হতে হয় দেশের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক হিসেবে। বিশেষ করে বিমানবন্দরে প্রতিনিয়ত তাদের হেনস্থার চিত্র সে কথাই মনে করিয়ে দেয় তাদের।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার 'বিশ্ব অভিবাসন প্রতিবেদন ২০২২'-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ছিলো ৭৪ লাখ। গত অক্টোবরে প্রকাশিত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই লাখ ৭১ হাজার ৯৫১ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশ গেছেন। প্রতিনিয়তই এ সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিট্যান্স বাড়লেও সেবার মান বাড়ছে না। যাদের হাত ধরে জিডিপির অগ্রগতি, তাদের সেবার মান দিন দিন কমছে। সংশ্লিষ্ট সব দফতরেই হতে হয় ভোগান্তির শিকার। তাদের সঙ্গে আচরণ করা হয় চাকর-বাকরের মতো। এ নিয়ে কিছু বলতে গেলেও আটকে দেয়া হয় পদে পদে।
প্রবাসী কর্মীদের সম্বোধন করা হয় ‘তুই’ বলে। কথা বলা হয় ধমকের সুরে। ঝামেলা এড়াতে চুপ করে থাকেন প্রবাসীরা। নির্ধারিত পোশাক না পরায় সংস্থার কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগও করা যায় না
মহামারী করোনায় যখন দেশের সব শিল্প কারখানা, অফিস আদালত বন্ধ এবং রফতানি খাতে তৈরি হয় বড় ধরনের সঙ্কট, ঠিক তখনও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই ঘুরিয়েছে অর্থনীতির চাকা। এসময় প্রবাসী আয়ে রিজার্ভ ছাড়িয়েছে ৪৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। গেলো নভেম্বরে এসেছিলো ১৫৫ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। গত বছরের ডিসেম্বরে ২০৫ কোটি ডলার, ১৯ সালের ডিসেম্বরে ১৫৯ কোটি ১৬ লাখ ডলার এবং গত অর্থবছরের জুলাইয়ে এসেছিল এযাবৎকালের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স ২৬০ কোটি ডলার।
বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রাথমিক কাজ হলো পাসপোর্ট করা। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসে যেতে চায় এমন লোকদের ভোগান্তির শুরুটাই হয় পাসপোর্ট অফিস থেকে। দালাল ছাড়া পাসপোর্ট করা অনেকটাই অসম্ভব। তাই ভোগান্তির ভয়ে বাধ্য হয়েই লোকজন ছুটছেন দালালের পেছনে। যে কারণে তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। এরপর ভিসা পাওয়া থেকে শুরু করে সবখানেই পকেট কাটা হয় তাদের। বিমানের টিকিটেও রয়েছে বড় ধরনের সিন্ডিকেট। কয়েক মাস আগে করোনাকালে এয়ারলাইন্সগুলোতে লাইন ধরেও যখন প্রবাসীরা টিকেট পাচ্ছিলেন না, ঠিক একই সময়ে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে তিনগুণ দামে খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছিলো বিমানের এসব টিকেট। তখন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিমানের টিকেটগুলো আগেই কিনে নিয়েছেন সিন্ডিকেট সদস্যরা।
সূত্রমতে, একেকটি ট্রাভেল এজেন্সি ফ্লাইট শুরুর আগেই কোটি টাকা পর্যন্ত ইনভেস্ট করেছেন এসব টিকেটের জন্য। ফ্লাইট শুরু হওয়ার পর কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে টিকেটগুলো চলে যায় সেই সিন্ডিকেটের দখলে। যে কারণে বাড়তি দামেই টিকেট সংগ্রহ করতে হয় প্রবাসীদের। কয়েকদিন আগেও ভয়াবহ ট্রলি সংকটের কারণে বিমানবন্দরের বেল্ট থেকে লাগেজ মাথায় নিয়ে বের হতে দেখা যায় যাত্রীদের। এরপর সমস্যার কিছুটা সমাধান হলেও ‘ট্রলিম্যান সংকট’-এর কারণ দেখিয়ে ক্যানোপি গ্রিল দিয়ে ট্রলি আটকে দেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। যে কারণে পার্কিং জোনের গাড়ি পর্যন্ত ট্রলি নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাথায় করেই নিতে হচ্ছে লাগেজ। এ নিয়ে গত ১২ ডিসেম্বর দুঃখ প্রকাশ করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেছেন, বিমানবন্দরের জন্য ফেব্রুয়ারির মধ্যে আড়াই হাজার ট্রলি কেনা হবে। ট্রলিম্যান হিসেবে ৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ইমিগ্রেশন, কাস্টমস এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মীদের আচরণ নিয়ে। বেশিরভাগ সময় প্রবাসী কর্মীদের সম্বোধন করা হয় ‘তুই’ বলে। কথা বলা হয় ধমকের সুরে। ঝামেলা এড়াতে চুপ করে থাকেন প্রবাসীরা। প্রবাসীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কেউই মানছেন না। ইমিগ্রেশন পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও আনসার সদস্য ছাড়া আর কোনও সংস্থার কর্মীরাই নির্ধারিত পোশাক পরেন না। যে কারণে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও করা যায় না। হেল্প ডেস্কের কর্মীদের কাছে সহযোগিতা চাইলেও চাহিদা মতো পাওয়া যায় না। ফরম পূরণে সহায়তা চাইলে পাঠিয়ে দেয়া হয় বুকিং কাউন্টারে। যেখানে ফরম পূরণ বাবদ জন প্রতি হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে ২০০ টাকা করে।
হেল্প ডেস্কের সহযোগিতা চাইলেও পাওয়া যায় না। ফরম পূরণে সহায়তা চাইলে পাঠিয়ে দেয়া হয় বুকিং কাউন্টারে। যেখানে জনপ্রতি হাতিয়ে নেয়া হয় ২০০ টাকা করে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সৌদি প্রবাসী বাবুল হোসেন বলেন- ‘ক্যানপি–২ এর বাইরে ট্রলি নিতে দেয় না নিরাপত্তাকর্মীরা। তাদের আচরণ দেখে মনে হয় তারাই দেশের মালিক আর আমরা সব ভাড়াটিয়া। বাধ্য হয়ে মাথায় করে লাগেজ নিয়ে আসতে হয়েছে বাইরে। কিন্তু লাগেজ মাথায় নিয়ে তো আর গাড়ি ভাড়া করা যায় না। এখন নিজের ব্যাগ পাহারা দেবো, নাকি গাড়ি ভাড়া করবো?
বিদেশগামী কর্মীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে কোভিড-১৯ টিকা দেওয়ার জন্য সুরক্ষা প্লাটফর্মে চলতি বছরের ২ জুলাই থেকে রেজিস্ট্রেশন শুরু করে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। পরে চালু করে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপ। কিন্তু ডাটাবেজে নিবন্ধন ও স্মার্টকার্ড না থাকায় সেখানেও ভোগান্তির শিকার হন প্রবাসীরা। এদিকে রাজধানীর সাতটি হাসপাতালে প্রবাসীদের টিকা কেন্দ্র নির্ধারণ করে দেয়ায় কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই টিকা নিতে ঢাকায় আসতে হয় প্রবাসীদের। অ্যাপে নিবন্ধনের পর পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনেও গেছে সাত থেকে দশ দিন। এরপর আবার নির্দিষ্ট দিনে এসেও টিকা পাননি অনেকে। টিকার জন্য বিক্ষোভও করতে হয়েছিল প্রবাসী কর্মীদের। এদিকে আরব আমিরাত সরকার গত ৪ আগস্ট শর্ত দেয়- বিমানবন্দরে র্যাপিড পিসিআর টেস্ট মেশিন না থাকা দেশগুলো থেকে যাত্রী প্রবেশ করতে পারবে না। ওই তালিকায় বাংলাদেশও ছিল। ল্যাবের দাবিতে বিক্ষোভ-মানববন্ধনও করতে হয়েছে আমিরাত প্রবাসীদের। পরে ল্যাব স্থাপন করে কার্যক্রম শুরু করতে প্রায় মাসখানেক লেগে যায়।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা বলছেন, একজন কর্মী যখন সিদ্ধান্ত নেয় বিদেশ যাওয়ার, তখন থেকে তার দুর্ভোগ শুরু। প্রতিটি ধাপেই ভোগান্তি। এ কাজ সহজ করতে স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট অধিদফতর, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটা সমন্বয় জরুরি। প্রবাসী কর্মীরা যখন অসহায় হয়ে রাস্তায় নামে তখন আমরা সমাধানের পথ খুঁজি। অনেকের ধারণাই এমন যে, কর্মীরা টাকা খরচ করে যাবে, জায়গা-জমি বিক্রি করে যাবে। দুর্ভোগ, ভোগান্তি সব তাদের ওপর দিয়ে যাবে। এমন যদি হয় তবে আমাদের নীতি নির্ধারকদের কাজটা কী?
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান কিছু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রবাসী কর্মীদের নূন্যতম সুযোগ সুবিধা, সম্মান দেওয়া হয় না। কেন প্রবাসীকর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হবে, কেন তাদের বিমানবন্দরে ভোগান্তিতে পড়তে হবে, কেন তাদের লাগেজ মাথায় তুলতে হবে। শুধু অবকাঠামো বৃদ্ধি করলেই হবে না, সমস্যা সমাধানে সেবা দেওয়ার মানসিকতাও জরুরি। বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ নার করার শর্তে বলেন, প্রতি মাসে সব সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বয় সভা হয়। কিন্তু সমন্বয় আর হয় না। কোনও সংস্থা নিজেদের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কথা বলে না। একে অন্যকে দোষ দিতেই ব্যস্ত থাকে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনও ভোগান্তি সৃষ্টি করা হয়নি বলে জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ বলেন, বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন আছে, ইমিগ্রেশন আছে। তারা বলবে ভোগান্তি কেন। প্লেনের ভাড়া বেশি হওয়ার বিষয়ে এয়ারলাইন্সগুলো বলতে পারবে। বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আমরা ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। যেখানে সম্ভব হয়েছে দ্রুত কাজ করেছি।
এদিকে, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) জরিপ বলছে করোনাকালে প্রায় পাঁচ লাখ প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। বেতন ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিকসহ গড়ে তাদের ক্ষতি হয়েছে এক লাখ ৭৯ হাজার ৯৮৯ টাকা। এদের ৮৫ শতাংশ পুরুষ কর্মী। তারা গড়ে এক লাখ ৯৪ হাজার টাকা ও নারী কর্মীরা গড়ে ৯৭ হাজার টাকা বেতন হারিয়েছেন।
আনন্দবাজার/শহক









