নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে বিভীষিকাময় এক ঘটনার এক যুগ পূর্ণ হলো আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল)। ২০১৪ সালের এই দিনে আলোচিত ‘সাত খুন’ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে, যা পরবর্তীতে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে এক যুগ পেরিয়ে গেলেও মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় কার্যকর না হওয়ায় এখনো ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন নিহতদের স্বজনরা।
ঘটনার দিন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম আদালত থেকে জামিন নিয়ে প্রাইভেট কারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চার সহযোগী। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় সাদা পোশাকে র্যাব পরিচয়ে একটি দল তল্লাশিচৌকি বসিয়ে তাঁদের আটক করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে ওই সড়ক থেকেই নিখোঁজ হন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক।
পরবর্তীতে তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের মরদেহ এবং পরদিন আরও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাতজনের এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
মামলার রায়ে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। দণ্ডিতদের মধ্যে র্যাব-১১-এর সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনও ছিলেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং অন্যদের দণ্ড কমিয়ে বা বহাল রেখে রায় প্রদান করে।
মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে লিভ টু আপিল পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, সেদিন নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে একটি প্রাইভেট কার থেকে অপহরণ করা হয়। একই সময় ঘটনাস্থল প্রত্যক্ষ করায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর চালককেও তুলে নেওয়া হয়, ফলে অপহৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতজনে। পরবর্তীতে তাদের নরসিংদী ও কাঁচপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে।
তদন্তে আরও জানা যায়, মরদেহ গুম করতে শীতলক্ষ্যা নদী হয়ে মেঘনা নদীর মোহনায় ফেলে দেওয়া হয় এবং শরীরে ভারী বস্তু বেঁধে দেওয়া হয় যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। পরে র্যাবের কয়েকজন সদস্য আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ঘটনার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ ও সিটি করপোরেশনের রাস্তা নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টিও তদন্তে উঠে আসে। নিহত নজরুল ইসলামের পরিবারের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
নিহতদের পরিবার অভিযোগ করে আসছে, রায় ঘোষণার বহু বছর পার হলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। তারা দ্রুত বিচার কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।
এক যুগ পেরিয়ে গেলেও নারায়ণগঞ্জের এই সাত খুন মামলা এখনো বিচার ও কার্যকর রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায়—যা নিহতদের পরিবার ও দেশবাসীর জন্য এক গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।









