আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত গণভোট বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, র্যাব, বিডিপি, কোস্ট গার্ড ও বিজিবি’র শীর্ষ কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করাই তাদের মূল কাজ। তিনি বলেন, এটি জাতির জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ এবং এটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের দিন যেন কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে, সেই বিষয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগী হতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি কোথাও কোনো গলদ যেন না থাকে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচন যেন ভবিষ্যতে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়—এটাই লক্ষ্য।
তিনি বলেন, এখন থেকে ধাপে ধাপে পরীক্ষা শুরু হয়েছে; আজ থেকে শুরু, ১২ ফেব্রুয়ারি হবে ফাইনাল। ইসির নির্দেশনাই সর্বোচ্চ নির্দেশ, তাই সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ড. ইউনূস বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে। পাশাপাশি নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে বডি ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে এবং কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সবকিছু মনিটরিং করা হবে।
এছাড়া বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ে কোনো ঘাটতি যেন না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন, তাই আমাদেরও সুপার সিরিয়াস থাকতে হবে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ সভায় জানান, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় তিনশো সদস্যের পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে পারে।
তিনি আরও জানান, আজ মধ্যরাত থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণা চলবে। পাশাপাশি সাইবার স্পেসে তথ্য বিকৃতি এবারের বড় চ্যালেঞ্জ এবং দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট ও পোস্টাল ব্যালট গণনায় বাড়তি সময় লাগতে পারে; তাই অপতথ্য বা গুজব না ছড়ানোর জন্য গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান।
সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৩ হাজার ৬১৯টি অস্ত্র লুট হয়, এর মধ্যে ২ হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে লুট হওয়া গোলাবারুদের মধ্যে ৫২ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, এবারের নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্য ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন, যাতে কেউ কোনো প্রকার বেআইনি কার্যক্রম করতে না পারে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োজন হলে ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি জানান, পাঁচ দিনের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে বডি ক্যামেরা পৌঁছে যাবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন মাঠে থাকবে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টিম নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং ও রেকর্ড করবে এবং বডি ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনা রেকর্ড ও যোগাযোগ করা সম্ভব হবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সভার শেষ দিকে বলেন, বডি ক্যামেরার ব্যবহার যথাযথভাবে করা গেলে বিশাল সাফল্য পাওয়া সম্ভব এবং এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে বা প্রয়োজন হলে আরও কম দিনের ব্যবধানে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।









