একাত্তরে স্বাধীনতার পর নাইলোটিকা নামের তেলাপিয়ার একটি জাত প্রথম থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন গবেষকরা। পরীক্ষামূলক চাষাবাদের পাশাপাশি মাছটি নিয়ে গবেষণা চলতে থাকে প্রায় এক দশক ধরে। এরপর আশির দশকে এসে তেলাপিয়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দ্রুত বেড়ে ওঠা ও লাভজনক হওয়ায় দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায়। এতে তেলাপিয়া চাষ ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। বর্তমানে বাজারে সাধারণ মানুষের মাছ হিসেবে তেলাপিয়া বেশ জনপ্রিয়।
বলা যায়, দেশে মৎসবাণিজ্যের পাশাপাশি মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে তেলাপিয়া। কম দাম আর খেতে সুস্বাদু হওয়ায় তেলাপিয়াকে গরীবের মাছও বলছেন অনেকে। যদিও এই মাছের ফিডের উপকরণ আর এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশ আলোচনা রয়েছে। তবে জনপ্রিয়তা তাতে কোনোভাবেই কমেনি।
সম্প্রতি জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার দেয়া তথ্যমতে, বিশ্বে তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদন ও মাছ আহরণের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে পঞ্চম স্থান দখলে নিয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে যেখানে ছোট মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র ৬৭ হাজার টন, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আড়াই লাখ টনে। অথচ দেশে বর্তমানে বছর প্রায় ৪ লাখ টন তেলাপিয়া উৎপাদন হচ্ছে।
গবেষকদের দেয়া তথ্যমতে, তেলাপিয়ার যে জাতটি এখন চাষ হচ্ছে সেটি ১৩তম প্রজন্ম। যা গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবন করা। এই প্রজন্মের তেলাপিয়া যারা চাষ করছেন তারা প্রথমজাতের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি উৎপাদন পাচ্ছেন। বাজারে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের যেসব তেলাপিয়া কিনতে পাওয়া সেগুলোও বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ও বিজ্ঞানী ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, তেলাপিয়া মূলত দেশের মাছ চাষকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। যা এটা পুরোটাই আমাদের গবেষণার ফল। ধারাবাহিক গবেষণার ফলেই মাছ চাষে এত বেশি সফলতা এসেছে। বর্তমানে সব মিলে প্রতিবছর মাছ উৎপাদন ৪৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে, যা চাহিদার চেয়ে বেশি।
বিএফআরআই ও মৎস্য অধিদফতর সূত্রমতে, নব্বইয়ের দশকে পোনা উৎপাদনের জন্য হ্যাচারির সংখ্যা ছিল ৬০-৬৭টি। বর্তমানে এই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৯৫০টিতে। যার মধ্যে ৮২০টিই বেসরকারি মালিকানাধীন। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত গবেষকরা বিভিন্ন মাছের ৬০টি জাত, প্রজনন ও চাষাবাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এসব উদ্ভাবন মৎস্য খামার ও হ্যাচারিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গবেষণার জন্য ১৯৮৪ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটট। একসময় মুক্ত জলাশয়ের চেয়ে বাংলাদেশ এখন বদ্ধ জলাশয়ের চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চাষের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা বিভিন্ন প্রকারের ছোট মাছ, কই, শিং, রুই কাতলাসহ বিভিন্ন মাছের জাত উদ্ভাবন করে এই প্রযুক্তিগুলো খামারিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
বিএফআরআই মহাপরিচালক বলেন, মৎস্য খাতে গবেষণায় জোর দেয়ার জন্য গত ৫-৭ বছরে একশর বেশি বিজ্ঞানীর নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক









