বিদায়ী সপ্তাহ (রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার) খরা কাটিয়ে উত্থানে ফিরেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। সপ্তাহটিতে লেনদেন পরিমাণ আগের সপ্তাহ তুলনায় বেড়েছে। সব ধরনের সূচক উত্থানে। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর বেড়েছে। ভালো কোম্পানির শেয়ার কদরও বেশি। সপ্তাহটিতে ‘এ’ ক্যাটাগরির ৯০ ভাগ কোম্পানির শেয়ার টপটেন লেনদেন অবস্থান করে। পাশাপাশি ৮০ ভাগ টপটেন লুজার ও ৮০ ভাগ টপটেন গেইনারে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার দর অবস্থান করেছে। ডিএসইর সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
গেল সপ্তাহে লেনদেনের শীর্ষে থাকা ১০ কোম্পানি ৮৯৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা ৩২ দশমিক ৬৭ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচা করে। সেখানে ৩৯৩টি কোম্পানি লেনদেন হয় ২ হাজার ৭৪৪ কোটি ২৬ লাখ ৪০ হাজার ২১২ টাকার শেয়ার। এসময় বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) একাই ২১৬ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকার বা ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচা হয়। সপ্তাহটিতে কোম্পানির শেয়ার প্রতি দর বেড়েছে ১ দশমিক ১০ শতাংশ।
এদিকে, ‘গত সপ্তাহের শেষে ডিএসইর পিই রেশিও অবস্থান করে ১৫ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। যা আগের সপ্তাহের শেষে ছিল ১৫ দশমিক ২০ পয়েন্ট। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পিই রেশিও বেড়েছে দশমিক ২১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।’
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ১৫ পয়েন্ট ছাড়ালেই তা বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) মার্জিন ঋণের যোগ্যতা হিসেবে সর্বোচ্চ ৪০ পিই রেশিও বেঁধে দিয়েছে। এ হিসেবে ৪০ পর্যন্ত পিইধারীর শেয়ার বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ বলে জানায় বিএসইসি। সেই হিসেবে গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর পিই দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৪১ পয়েন্টে। মানে পিই রেশিও হিসাবে বিনিয়োগ নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে।
গেল সপ্তাহে অর্থের পরিমাণে লেনদেন সেরা অবস্থানে বেক্সিমকোর শেয়ার। সপ্তাহটিতে কোম্পানিটির শেয়ার দর লেনদেনের শীর্ষ স্থান দখল করে। অপরদিকে নতুন কোম্পানি বা ‘এন’ ক্যাটাগরির জেএমআই হাসপাতালের শেয়ার লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে ওঠে আসে। দর বেড়ে তৃতীয় অবস্থানে ওঠে আসে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের শেয়ার। ওই তিন কোম্পানি ৪৮০ কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা শেয়ার কেনাবেচা হয়। সপ্তাহটিতে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৩৭টি শেয়ার কেনাবেচা হয়।
বিদায়ী সপ্তাহটিতে বেক্সিমকো একাই ২১৬ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকার বা ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচা হয়। গত বৃহস্পতিবার শেয়ার প্রতি দর দাঁড়ায় ১৪৭ টাকা। আগের সপ্তাহে বুধবার (১৩ এপ্রিল) শেয়ার প্রতি দর ছিল ১৪৫ দশমিক ৪০ টাকা। কোম্পানির শেয়ার প্রতি দর বেড়েছে ১ দশমিক ৬০ টাকা। এসময় ১ কোটি ৫১ লাখ ৫৯ হাজার ৪২১টি শেয়ার লেনদেন হয়। দ্বিতীয়তে থাকা জেএমআই হাসপাতাল একাই ১৭৫ কোটি ৫৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকার বা ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচা হয়। গত বৃহস্পতিবার শেয়ার প্রতি দর দাঁড়ায় ৭৪ দশমিক ৫০ টাকা।
আগের সপ্তাহে বুধবার (১৩ এপ্রিল) শেয়ার প্রতি দর ছিল ৫১ দশমিক ৪০ টাকা। কোম্পানির শেয়ার প্রতি দর বেড়েছে ২৩ দশমিক ১০ টাকা বা ৪৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তৃতীয়ত্ব থাকা বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন একাই ৮৮ কোটি ৯১ লাখ ১৩ হাজার টাকার বা ১১ দশমিক ৯৭ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচা হয়। গত বৃহস্পতিবার শেয়ার প্রতি দর দাঁড়ায় ১১৭ দশমিক ৯০ টাকা। আগের সপ্তাহে বুধবার (১৩ এপ্রিল) শেয়ার প্রতি দর ছিল ১০৫ দশমিক ৩০ টাকা। কোম্পানির শেয়ার প্রতি দর বেড়েছে ১২ দশমিক ৬০ টাকা বা ১১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
সাপ্তাহিক লেনদেন শীর্ষে উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে সোনালী পেপার ৮৭ কোটি ৩৬ লাখ ২৩ হাজার টাকা, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ৮৪ কোটি ৭৬ লাখ ৮ হাজার টাকা, লার্ফাজ-হোল্ডসিম ৬৫ কোটি ৯৩ লাখ ৭ হাজার টাকা, ফরচুন সুজ ৫২ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্কয়ার ফার্মা ৪৭ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, বিডি কম অনলাইন ৩৯ কোটি ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং জেনেক্স ইনফোসিস ৩৮ কোটি ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়।
ডিএসইর সূত্রমতে, গেল সপ্তাহে টপটেন গেইনার তালিকায় ৮০ ভাগ ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ারের অবস্থান করে। টপটেন লুজারেও ৮০ ভাগ ‘এ’ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ারের দাপট ছিল। এই ধরনের লেনদেন চিত্রকে সবাই স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টারা। তারা বলছে, ‘এ’ ক্যাটাগরির বা ভালো কোম্পানির শেয়ার লেনদেন বেশি হওয়া ভালো লক্ষন। এটা পুঁজিবাজার ইতিবাচক গতি আরো বৃদ্ধি করবে।
গেল সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০৪টির বা ৫১ দশমিক ৯০ শতাংশ শেয়ার ও ইউনিট দর বেড়েছে। সপ্তাহটিতে ‘এন’ক্যাটাগরির জেএমআই হাসপাতাল শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি ছিল। গেল সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ বৃদ্ধির মাধ্যমে কোম্পানিটি ডিএসইর সাপ্তাহিক টপটেন গেইনারে শীর্ষে উঠে আসে।
অপরদিকে লেনদেনে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৪০টির বা ৩৫ দশমিক ৬২ শতাংশ শেয়ার ও ইউনিট দর কমেছে। সপ্তাহটিতে প্রিমিয়ার ব্যাংক শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সবচেয়ে কম ছিল। গেল সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ। এই কমার মাধ্যমে কোম্পানিটি ডিএসইর সাপ্তাহিক টপটেন লুজারের শীর্ষে উঠে আসে।
উল্লেখ্য ‘পুঁজিবাজারের ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ার ‘বি’ ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির থেকে তুলনামূলক ভালো। নিয়ম অনুসারে, যেসব কোম্পানি বছর শেষে তাদের শেয়ারহোল্ডারদের সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে তার ঊর্ধ্বে লভ্যাংশ (নগদ বা বোনাস) দেয় তারাই ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার। যেসব কোম্পানি বছর শেষে তাদের শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নিচে থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ লভ্যাংশ (নগদ বা বোনাস) দেয় তারা ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার।
যেসব কোম্পানি বছর শেষে তাদের শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ নিচে থেকে শুরু জিরো লভ্যাংশ (নগদ বা বোনাস) দেয় তারাই ‘জেড’ ক্যাটাগরি কোম্পানির শেয়ার। এছাড়া এন ক্যাটাগরি নতুন কোম্পানির শেয়ার। যেগুলোর পুঁজিবাজারের লেনদেন শুরু হয়েছে কিন্তু বছর পার হয়নি, সেইগুলো ‘এন’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে।
সপ্তাহটিতে টপটেন গেইনারে উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন ১১ দশমিক ৯৭ শতাংশ, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ১০ দশমিক ৮২ শতাংশ, লাভেলো আইসক্রিম ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ, ক্রাউন সিমেন্ট ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ইনটেক (‘বি’ ক্যাটাগরি) ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ, কুইন ইন্ডাস্ট্রিজ ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, বিকন ফার্মা ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ করে শেয়ার দর বেড়েছে।
অপরদিকে, টপটেন লুজারে উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে জেমিনি সী (‘বি’ ক্যাটাগরি) ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ, তাকাফুল ইসলামি ইন্স্যুরেন্স ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ, আরামিট ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্স (‘জেড’ ক্যাটাগরি) ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ, রেইনউক যজ্ঞেশ্বর ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, বাংলাদেশ মনসপুল পেপার ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং আইসিবি এএমসিএল ২য় ফান্ড ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ করে শেয়ার দর কমেছে।
আনন্দবাজার/শহক









