আগামী অর্থবছরের (২০২২-২০২৩) জন্য ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। যা চলতি অর্থবছরের (২০২১-২০২২) বাজেটের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ গুণ বেশি। গতকাল রবিবার অর্থনীতি সমিতির অডিটোরিয়ামে‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২২-২৩: একটি জনগণতান্ত্রিক বাজেট প্রস্তাব’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সভায় সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত এ প্রস্তাব রাখেন।
এদিকে “আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য প্রাথমিকভাবে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাবনা তৈরি করেছে সরকার। নতুন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এতে মূল্যস্ফীতি ধরা হয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।” “এর আগে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২০২২) বাজেটের আকার বা মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।”
আগামী ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য ২০ লাখ ৫০ হাজার ৩৬ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট পেশ করেছে অর্থনীতি সমিতি। নতুর প্রস্তাব চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ গুণ বেশি। বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস রাজস্ব আয় ধরা হয় ১৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। যেখানে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়ার হয়। একই সঙ্গে কালো টাকা উদ্ধার ও পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে নতুন বাজেটের ঘাটতি পূরণের কথা বলা হয়। বিকল্প বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও ব্যাংক ঋণকে নিরুৎসাহিত করা হয়।
প্রস্তাবিত জনগণতান্ত্রিক ২০ লাখ ৫০ হাজার ২৬ কোটি টাকার বিকল্প বাজেট প্রস্তাব করছি জানিয়ে আবুল বারকাত বলেন, বাজেট সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সমাজ থেকে চার ধরনের বৈষম্য। যথা- আয় বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বৈষম্য ক্রমাগত হ্রাস করে নির্মূলের দিকে যাওয়া। এ লক্ষ্যে আয় ও ব্যয় খাতে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। দ্বিতীয়ত বাজেটে অর্থায়নের প্রান্তিক, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্য মধ্যবিত্তের ওপর কর দাসত্ব আরোপ করা যাবে না। এরপর রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সুপারিশ।
মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। শর্ত হলো কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকার মূল্যস্ফীতির যে হিসাব দিচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কোনো অবস্থাতে বাড়ানো যাবে না।
সরকারের মেগাপ্রকল্প প্রসঙ্গে আবুল বারকাত বলেন, মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে যখন থেকে আমরা অন্তত ৪ থেকে ৫টি মেগাপ্রকল্পের সুদ পরিশোধ শুরু করব, তখন থেকেই ঋণের ক্ষেত্রে সরাসরি রেড জোনে চলে যাব। যা আনুমানিক হিসাবে ২০২৭-২০২৮ সালে শুরু হওয়ার কথা। আর ২০৩২ সালে যখন ১২টি মেগা প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দিতে যাব, তখন বিপদ আরো প্রকট হওয়া আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক মহামন্দা, বৈশ্বিক মহামারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব ভবিষ্যতে আমাদের বৈদেশিক ঋণের রেড ঝুঁকিতে ফেলবে কি না তা নিয়ে কঠিন চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে আবুল বারকাত বলেন, দেশের মেগা প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ যখন শোধ করা শুরু হবে তখন আমরা সরাসরি রেড ঝুঁকিতে চলে যাবে। সংকট সমাধানে আর কোনো মেগা প্রজেক্ট নেওয়া যাবে না, কোনো প্রজেক্টের মেয়াদ বাড়ানো যাবে না।
আমরা প্রত্যক্ষ করে ওপর জোর দিয়ে আবুল বারকাত বলেন, পরোক্ষ করের কারণে মানুষে মানুষে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। আমরা প্রস্তাব করছি দরিদ্র অতি দরিদ্রদের আগামী কয়েক বছরে নেটের বাইরে রাখার। বিকল্প বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয় ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। যা প্রস্তাবিত বিকল্প বাজেটের ৯২ শতাংশের বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয়ের ৭৭ শতাংশ আসবে প্রত্যক্ষ কর থেকে, বাকিটা পরোক্ষ কর। যেখানে প্রত্যক্ষ কর থেকে আসে মাত্র ৪৬ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি ৭ শতাংশ, যা সরকারের চলতি বাজেটে ঘাটতি তুলনায় অনেক কম। বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ কিংবা দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণের প্রয়োজন নেই। সমস্যাটা অর্থনৈতিক হলেও সমাধান তার রাজনৈতিক। বাজেট ঘাটতি পূরণে তিনি কালো টাকা ও বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরতের প্রতি জোর দেন।
আমাদের আরেকটি বড় কষ্ট হলো সবকিছু এককেন্দ্রিক ও ঢাকামুখী, যা উন্নয়ন সহায়ক নয় জানিয়ে আবুল বারকাত বলেন, তাই আমাদের প্রস্তাবে কোন মন্ত্রণালয় কোন বিভাগে যাবে এটি রয়েছে। এছাড়া আমাদের বাজেটে মোট বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এখানে মোট বরাদ্দ বাজেটের ২১ শতাংশ। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার খাত হচ্ছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত, তৃতীয় হচ্ছে কৃষি। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের বৈষম্য বেড়েছে। এসব পাল্টাতে হবে, ঝুঁকি হ্রাস করতে হবে। সেজন্য আমরা গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চা অধিক গুরুত্ব দিয়েছি। গবেষণা উন্নয়নের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমরা নতুন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব করছি। যার নাম গবেষণা উদ্ভাবন বিচ্ছুরণ ও উন্নয়ন। এই মন্ত্রণালয়ের জন্য আগামী পাঁচ বছরে ৫ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলছি। আরেকটি মন্ত্রণালয় কথা আমরা বলেছি সেটা হলো গণপরিবহন মন্ত্রণালয়।
ভার্চুয়াল সভার সঞ্চালনায় ছিলেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম। সম্মেলনে দেশের ৬৪টি জেলা, ১০৭টি উপজেলা এবং ২১টি ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিরা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
আনন্দবাজার/শহক









