দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে গণভোট ও সংবিধান সংস্কার ইস্যু ঘিরে। সদ্য গঠিত সরকারের বয়স মাত্র দেড় মাস হলেও এরই মধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংসদের ভেতরের এই উত্তেজনা এখন ধীরে ধীরে রাজপথেও ছড়িয়ে পড়ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় এবং জাতীয় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্যদিকে বিরোধী দলে অবস্থান নেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১ দলীয় জোট।
তবে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে এখন দ্বিমত তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিরোধী জোটের অভিযোগ, গণভোটে জনগণ স্পষ্টভাবে সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দাবি আদায়ে শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে ৭ এপ্রিল শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণার কথাও জানিয়েছে বিরোধী পক্ষ।
অন্যদিকে সরকারি দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তবে তারা জুলাই সনদের মূল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। এজন্য সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে তারা। ইতোমধ্যে এমন একটি কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে গণভোট আয়োজনের অধ্যাদেশ ঘিরে। সংসদীয় কমিটি ওই অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি সংসদে উপস্থাপন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এতে পুরো গণভোটের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি এখন জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ৩ মার্চ হাইকোর্ট গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন। ফলে বিষয়টি আদালতের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে আইনজীবীদের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা গেছে। অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, শুরু থেকেই অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, ফলে এটি বাতিল হলে গণভোটও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তবে ব্যারিস্টার আহসানুল করিমের মতে, অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত না হলেও ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোট বাতিল হবে না।
এদিকে রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করছে বিরোধী জোট। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট শনিবার বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে। পাশাপাশি গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে জনমত গঠনের পরিকল্পনাও নিয়েছে তারা। সরকারের অবস্থান পরিবর্তন না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৩ নভেম্বর জারি হওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোট পড়ে এবং এর মধ্যে ৬৮ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে সনদটি অনুমোদিত হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না হওয়ায় এখন আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, গণভোটের ফল বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি এবং আইনি বৈধতা নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দেশের রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।









