জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বিদেশে পালিয়ে গেলেও অনেকে দেশেই আত্মগোপনে চলে যান। তাদের মধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হলেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।
গতকাল মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর ধানমণ্ডির তার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
দীর্ঘদিন পর তার গ্রেপ্তারের ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এত দিন তিনি কোথায় ছিলেন এবং কীভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়িয়ে অবস্থান করছিলেন?
বুধবার একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদপত্র বিশ্লেষণ অনুষ্ঠানে বিশ্লেষক ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, কে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দিয়েছিল—এসব বিষয় তদন্ত হওয়া জরুরি। এ ছাড়া গ্রেপ্তারের পর বিচার হতে হবে স্বচ্ছ ও আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, যেন এটি ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এ পরিণত না হয়।
তিনি বলেন, যদি আগে থেকেই তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়ে থাকে, তাহলে তার বাসা এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যথাযথ তল্লাশি কেন পরিচালিত হয়নি—এটি একটি বড় প্রশ্ন। তিনি দীর্ঘদিন কোথায় ছিলেন, কে তাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
গ্রেপ্তারের সময়কাল বা ‘টাইমিং’ ভবিষ্যতের কোনো রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে কি না, সেটিও আলোচনায় উঠে এসেছে।
আলোচনায় অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী জোর দিয়ে বলেন, অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতা, দমন-পীড়ন এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে টার্গেট করা উচিত নয়।
আওয়ামী লীগ, এনসিপি, জামায়াত— যেকোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অপরাধ নয়; অপরাধ হলো আইন লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড।
তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া যেন ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এ পরিণত না হয়। অতিরিক্ত প্রচার ও চাপের কারণে বিচার প্রভাবিত হলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হতে পারে। ‘ডিউ প্রসেস অব ল’ বা আইনের সঠিক ধারা অনুসরণ করেই বিচার পরিচালনা করা জরুরি।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংকট, যেমন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোনো সুস্পষ্ট ‘ক্রাইসিস কো-অর্ডিনেশন কমিটি’ আছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি সমন্বিত কাঠামো থাকা উচিত, যেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা যাবে। বর্তমানে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবেলায় সরকারকে আরো সংগঠিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পুনর্গঠন ও সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে বোর্ডে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির। এসব বিষয়ে পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ক্রিকেট প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি, যেন জনআস্থা বজায় থাকে।
তিনি বলেন, তামিম ইকবাল দেশের একজন অভিজ্ঞ ও সফল ক্রিকেটার। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবদান বিবেচনায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তিনি মনে করেন, সঠিকভাবে কাজ করার সুযোগ পেলে তামিম বোর্ডে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন। তবে বিসিবির অন্য সদস্যদের নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
আলোচনায় এসেছে যে সম্ভাব্য চার সদস্যের মধ্যে বেশ কয়েকজনই প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য—যার মধ্যে মন্ত্রীদের সন্তান ও ঘনিষ্ঠজন রয়েছেন। যদিও তাদের যোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়নি, তবু তারা পেশাদার ক্রিকেট প্রশাসক না হওয়ায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রসঙ্গে ভারতের উদাহরণ টেনে বলেন, দেখেন অমিত শাহ-এর ছেলে জয় শাহ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত। একটি উদাহরণ দিয়ে পুরো কাঠামোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বলা যায় না।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে সব সিদ্ধান্ত দ্রুত জনসম্মুখে চলে আসে। তাই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত হলেই টাইমলাইনে আসা সম্ভব হবে। তবে এ প্রেক্ষাপটে বিসিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে তিনি আরো বলেন, তামিম ইকবালের নেতৃত্বে নতুন সূচনার সম্ভাবনা থাকলেও, বোর্ডের গঠন নিয়ে বিতর্ক এড়াতে স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।









