জ্বালানি তেল সংকটে যখন চারপাশে চরম অস্থিরতা চলছে, তখন নতুন ভোগান্তি হয়ে এসেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। তীব্র গরম শুরু হতেই বেড়েছে লোডশেডিংয়ের তীব্রতাও।
ভাপসা আবহাওয়ার মধ্যে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সামনে সেচ ও গ্রীষ্মকাল, তখন বিদ্যুতের চাহিদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অঙ্কের বকেয়া, ভর্তুকির ঘাটতি, জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত—সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন গভীর আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।
এদিকে গতকাল থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে নতুন সময়সূচিতে অফিস কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে দোকানপাট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত কিছুটা সংশোধন করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাড়িয়ে ৭টা করা হয়েছে।
যদিও অন্য দিনের মতো গতকালও পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য ভোক্তাদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির মজুদও ফুরিয়ে আসছে।
ফলে দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা না এলে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, দেশে গত কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। গত কয়েক দিন ধরে দিনে-রাতে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠছে।
যদিও গত মার্চে গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। চাহিদা বাড়ায় এখন এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি। কিছু কিছু উপজেলা শহরে দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ৭৫৫ থেকে ৭৬০ মেগাওয়াটে নেমেছে। যদিও আদানির দুটি কেন্দ্র চালু থাকলে এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এখন লোডশেডিংয়ের এটিও একটি কারণ হিসেবে বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তেল আমদানিতে এক মাসেই বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এলএনজি আমদানি করে এক মাসেই ঘাটতি হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা।
ভর্তুকির চাপ সামলাতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে অর্থ মন্ত্রণালয়। দ্বিগুণ দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে।
এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। দুই মাসে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তাই বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সর্বোচ্চ চাহিদার সময় দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরও আহবান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অফিস টাইম কমানোসহ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে।









