রমজান ও ঈদকে ঘিরে তারল্য সংকট এবং জরুরি খরচ মেটাতে লোকাল মার্কেটে মেল্টিং স্ক্র্যাপের দাম কিছুটা কমেছে। তবে বিশ্ববাজারে স্ক্র্যাপের দাম তেমন কমেনি।
করোনা মহামারির পুরো সময় জুড়ে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ও নির্মাণ কার্যক্রম থমকে যায়। সেই সঙ্গে কমে যায় রড তৈরির কাঁচামাল লোহার টুকরার উৎপাদন। আর সেই ধাক্কা এসে লাগে সরাসরি রডের বাজারে। মহামারির ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পর গত বছরের শেষ দিকে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি বাড়তে থাকে। আর তাতে দ্রুত বাড়তে থাকে নির্মাণের প্রধান কাঁচামাল রডের চাহিদা। তবে চাহিদার তুলনায় যোগান কমতে থাকে হু হু করে দাম বাড়তে থাকে।
ওদিকে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রড উৎপাদক দেশ চীন বিশ্ববাজার থেকে নিজেই পুরোনো লোহার টুকরা কিনতে শুরু করায় তেতে উঠতে শুরু করে কাঁচামালের বাজার। মূলত গেল বছরের নভেম্বর থেকে বিশ্ববাজারে রড তৈরির কাঁচামালের দাম বাড়ছে। দেশের বাজারেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রডের দাম। তাতে বিপাকে পড়েছেন ব্যক্তিখাতে বাড়ি নির্মাণকারী, আবাসন ব্যবসায়ী ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারেরা। তাছাড়া গত দেড়-দুই মাস ধরে রডের বিক্রিও ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
আগের চেয়ে চাহিদা ও বিক্রি কমে যাওয়ায় পণ্য দুটির দাম কমেছে টনে ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা। গত দেড় বছর ধরে টানা বৃদ্ধি পেয়ে রডের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পর পণ্যটির ব্যবহার কমে যাওয়ায় রড ও স্ক্র্যাপের বাজার স্থবির হয়ে আছে বলে মনে করছেন এই খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। রড তৈরির কাঁচামাল পুরোনো লোহার টুকরা সরাসরি আমদানি করে প্রায় ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে দেশীয় উৎপাদকেরা। বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ জাহাজভাঙা শিল্প থেকে আসে। উন্নত দেশগুলোতে পুরোনো অবকাঠামো ভাঙার পর এই কাঁচামাল পাওয়া যায়। আবার ইস্পাতের ব্যবহার্য পণ্যও কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গেল দুই বছর ধরে করোনা মহামারির প্রবল ধাক্কায় থমকে যাওয়া নির্মাণখাত গেল বছরের শেষ ভাবে এসে অনেকটা গতি পায়। উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার হতে শুরু করে। এতে বাজারে দ্রুত বাড়তে থাকে নির্মাণখাতের কাঁচামালের চাহিদা। তবে যোগান কমতে থাকায় দাম বাড়তে থাকে।
গত দুই সপ্তাহে ইস্পাতের বাজারে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে ৭৫ গ্রেডের (৫০০ টিএমটি) রডের দাম। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ব্রান্ডের প্রতি টন ৭৫ গ্রেডের রড বিক্রি হয়েছে ৮৫ থেকে ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা। যা দুই সপ্তাহ আগে ৮৭-৯১ হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। গেল সপ্তায় বাজারে বিভিন্ন ব্রান্ডের মধ্যে ৭৫ গ্রেডের (টিএমটি) বিএসআরএম ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা, কেএসআরএম ৮৭ হাজার টাকা, একেএস ও জিপিএইচ ৮৬ হাজার টাকা, গোল্ডেন, এসএএসএম ও বায়েজিদ ৮৫ হাজার টাকা এবং এইচএম স্টিল ৮৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
গত দুই সপ্তাহে সেমি অটো মিলের ৬০ গ্রেডের (৫০০ ওয়াট) রডের দামও ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে। বর্তমানে বাজারে ৬০ গ্রেডের শীতলপুর স্টিলের সেমি অটো এমএস রড প্রতি টন ৮২ হাজার টাকা, বিএম, আল ছাফা, রাইজিং, খলিল, বলাকা, আম্বিয়া, পেনিনসুলা ও মানতি স্টিলের রড ৮১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে ইস্পাতের পাশাপাশি ইস্পাত তৈরির কাঁচামাল বিলেট, প্লেইট ও স্ক্র্যাপের দামও কমে গেছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি টন স্ক্র্যাপ ৫৮ হাজার টাকা, প্লেট ৬৫ হাজার টাকা এবং বিলেট ৭২ হাজার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহে আগে স্ক্র্যাপ ৬৫ হাজার টাকা, প্লেট ৭১ হাজার টাকা এবং বিলেট ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর টানা উর্ধ্বমুখী ছিল রডের বাজার। এই সময় দফায় দফায় বেড়ে পণ্যটির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এভাবে দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় আবাসন ও অন্যান্য খাতের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
গোল্ডেন ইস্পাতের পরিচালক সরোয়ার আলম বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাপের দাম কমেছে ২০-৩০ ডলার। এতে গত দুই-তিন সপ্তাহে মানভেদে রডের দাম কমেছে টনে ৫-৬ হাজার টাকা পর্যন্ত কিন্তু রডের দাম সর্বোচ্চ চূঁড়ায় পৌঁছার পর গত দেড়-দুই মাস ধরে রডের বিক্রি ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কিছু সরকারি প্রকল্প ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে রডের চাহিদা একদম নেই বললেই চলে। গোল্ডেন ও এইচএম সিল মিলে আগে আমাদের প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার টন রড বিক্রি হতো। কিন্তু বর্তমানে দুইটি কারখানা থেকে রড বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৫০-৩০০ টন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান এবং ঈদকে ঘিরে তারল্য সংকট এবং জরুরি খরচ মেটাতে লোকাল মার্কেটে মেল্টিং স্ক্র্যাপের দাম কিছুটা কমেছে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম তেমন কমেনি। একই সময়ে রডের দামও কিছুটা কমেছে। স্ক্র্যাপ ও রডের দাম কমার কারণে ক্রেতা ও ডিলারদের ধারণা রডের দাম আরো কমতে পারে। এই ধারণা থেকে পণ্যটির চাহিদা ও বিক্রি কিছুটা কমে গেছে। তবে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ সংকটে স্ক্র্যাপের দাম আরো বৃদ্ধির আশংকা রয়েছে।









