চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কাস্টমস কর্মকর্তা ফজলুল হকের আইডি ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির রহস্য উদঘাটন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শুল্ক গোয়েন্দারা। মাত্র এক বছরেই (২০১৮ সালে) রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার এমন অসংখ্য চালান খালাস হওয়ার তথ্য পায় শুল্ক গোয়েন্দ ও দুদক। যদিও কাস্টমস কর্মকর্তা ফজলুল হক ২০১৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে বদলি হন, তবে তার বদলি হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ‘অ্যাসাইকুডা ওয়াল্ড সিস্টেমে’ ‘ফজলুল হকের’ আইডি থেকেই প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি লগইন করা হয়েছে।
দুদক ও শুল্ক গোয়েন্দার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফজলুল হক চট্টগ্রাম থেকে বদলি হলেও তার আইডি ব্যবহার করেছিলেন কাস্টম হাউসেরই কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বড় একটি চক্র। যারা এই একটি আইডি দিয়েই হাজার কোটি টাকারও বেশি শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন বলে ধারণা সংস্থা দুটির। যদিও ইতোমধ্যে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে, চলতি মাসেই দুদকের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান শেষে ১৪টি মামলা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট, কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যারে অনুপ্রবেশকারীসহ দেড়শ জনকে।
সূত্রমতে, ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া থেকে ‘সুইটক্রন’ আমদানির জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ব্যাংক ইমামগঞ্জ শাখায় ১০ শতাংশ নগদ মার্জিনে ৬ হাজার ৬৭৫ মার্কিন ডলার মূল্যের ঋণপত্র বা এলসি খুলেন জাহিদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি আমাদিকারক প্রতিষ্ঠান। আমদানি করা এসব পণ্য খালাসের কাজ পায় জাহিদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে এক সিএন্ডএফ এজেন্ট। যার প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর কাস্টম হাউসে যাবতীয় কাগজপত্র দাখিল করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মিথ্যা পণ্য ঘোষণা দিয়ে আমদানি ও বড় অংকের শুল্ক ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি খালাস কার্যক্রম স্থগিত রাখতে চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।
চিঠি পেয়ে কাস্টম হাউসের সুরক্ষিত সার্ভার ‘অ্যাসাইকুডা ওয়াল্ড সিস্টেমে’ চালানটি একই দিনে ‘ডু নট রিলিজ’ মর্মে লক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চালান খালাস প্রক্রিয়া বন্ধ করার দুই মাসের মাথায় তথা ২৬ ডিসেম্বর চালানটির খালাস প্রক্রিয়া সাময়িক সময়ের জন্য অবমুক্ত করা হয় কাস্টম হাউসেরই কর্মকর্তা ফজলুল হকের আইডি থেকে। শুধু তাই নয়, সেদিনই দুপুর ২টা ৪৭ মিনিটে কোনো ধরনের কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই এসব পণ্য খালাস করে নিয়ে যায় সিএন্ডঅ্যাফ এজেন্ট। খালাসের পরপরই চালানটি ফের ‘অ্যাসাইকুডা ওয়াল্ড সিস্টেমে’ ‘ডু নট রিলিজ’ মর্মে লক করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর পরে জানতে পারে, সাধারণত ৪০ ফুট কন্টেইনারে ৬৬ লাখ শলাকা সিগারেট আমদানি হয়ে থাকে।
উন্নত ব্রান্ডের বেনসন এন্ড হেজেস সিগারেটের ৬৬ লাখ শলাকা সিগারেটের ওপর আমদানি পর্যায়ে আদায়যোগ্য শুল্ক করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটি ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা। অথচ চালানটির খালাসের বিপরীতে রাজস্ব পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ বাকি ৮ কোটি ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে।
শুধু এই চালানের ক্ষেত্রেই নয়, গোয়েন্দাদের সংগৃহিত তথ্য বলছে, কাস্টমস কর্মকর্তা ফজলুল হকের আইডি থেকে মাত্র এক বছরেই (২০১৮ সালে) এমন অসংখ্য চালান খালাস হওয়ার তথ্য পায় শুল্ক গোয়েন্দ ও দুদক। যদিও কাস্টমস কর্মকর্তা ফজলুল হক ২০১৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে বদলি হয়, তবে তার বদলি হওয়ার পর ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ‘অ্যাসাইকুডা ওয়াল্ড সিস্টেমে’ ‘ফজলুল হকের’ আইডি থেকেই প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি লগইন করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, ফজলুল হকের আইডি ব্যবহার করে সার্ভারে প্রবেশ করেন মো. আব্দুল গোফরান ও জহুরুল ইসলাম নামে দুই ব্যক্তি। যাদের মধ্যে জহুরুল ইসলাম হচ্ছেন হামীম গ্রুপের কম্পিউটার অপারেটর। আর পাসওয়ার্ড ও ইউজার আইডি ব্যবহারে সহযোগিতা করেন কাস্টম হাউসের সহকারী প্রোগ্রামার কামরুল হক। তিনিই এসব পণ্য খালাসের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে পত্র পাঠাতেন। এসব বিষয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা সুলতান আহম্মদ, কম্পিউটার অপারেটর ফিরোজ আহমেদ, উচ্চমান সহকারী আব্দুল্লাহ আল মাছুম ও অফিস সহায়ক সিরাজুল ইসলাম তাকে সহযোগিতা করেন।
দুদক সূত্রমতে, ফজলুল হক ২০০৯ সাল থেকে মধ্যে এক বছর বাদে ২০১৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত ছিলেন। তিনি যখন বদলি হয়ে চলে যান, তখন আইডি পাসওয়র্ডের বিষয়টি কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গোপনে সংগ্রহ করেন। আর তা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবহার করতেন আব্দুল গোফরান ও জহুরুল ইসলাম। তারা দুইজনই আইডি ব্যবহার করতেন, আর কাস্টম হাউস থেকে সব ধরনের যাবতীয় চিঠিপত্র তৈরি করতেন অন্যরা। এ জন্য তারা বিভিন্ন আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে চুক্তিও করতেন। এভাবেই প্রায় হাজার কোটি টাকারও বেশি শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন মর্মে দুদকের কাছে অভিযোগ। যদিও ইতোমধ্যে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে আরও অনুসন্ধান চলমান আছে বলেও জানান দুদক কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে নাম না প্রকাশের শর্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সিএন্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাস্টম হাউসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনলাইন ভিত্তিক সফটওয়্যার ‘এসাইকুডা ওয়াল্ড সিস্টেমের’ ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে রাজস্ব ছাড়াই উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য খালাস করেন তারা। তবে ধারণা হচ্ছে, এ আইডি ছাড়াও আরও বহুজনের আইডি দিয়ে একই কায়দায় পণ্য খালাস করতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত বিষয়ে অনুসন্ধান কাজ চলমান আছে, তবে আর কোনো আইডি দিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে কিনা-তা উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদি সেই কর্মকর্তা।
আনন্দবাজার/শহক









