দেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করা নবনির্বাচিত সরকারের সামনে এখন সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক খাতের ত্রিমুখী সংকট। খেলাপি ঋণের পাহাড়, নজিরবিহীন অর্থপাচার এবং সুশাসনের চরম অভাব—এই তিন বিষফোড়া বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে ঠেলে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং এক কঠিন পরীক্ষা; যেখানে সফল হতে হলে প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক খাতের এই অস্থিতিশীলতা পুরো অর্থনীতির স্থিতি নষ্ট করে দিতে পারে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৩৫.৭৩ শতাংশই এখন অনিশ্চিত বা অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি পুঁজি বর্তমানে ঝুঁকির মুখে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ অনুমোদন, দুর্বল তদারকি এবং বছরের পর বছর ধরে চলা নীতিগত শিথিলতার কারণেই খেলাপি ঋণের এই ‘ক্যান্সার’ মহামারি আকার ধারণ করেছে। সাবেক ব্যাংকাররা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, নামসর্বস্ব বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং প্রকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে অর্থ আদায়ের জন্য একটি শক্তিশালী বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি গত দেড় দশকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ নতুন প্রশাসনের জন্য এক বিশাল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এই বিপুল অর্থ মূলত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ এবং এই পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, তবে অর্থপাচার রোধে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য ছাড়া রিজার্ভের স্থায়ী স্থিতিশীলতা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংক একীভূতকরণ, পর্ষদ পুনর্গঠন এবং তারল্য সহায়তার মতো কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হলেও বাজারের অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোই এখন সরকারের পয়লা নম্বর কাজ হওয়া উচিত।
সাবেক এই গর্ভনরের মতে, খেলাপি ঋণ আদায় ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত হলে হুন্ডি কমবে এবং রেমিট্যান্সের বৈধ প্রবাহ আরও বাড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট প্রকট হবে। তাই নতুন সরকারের সামনে এখন একটাই পথ—কঠোর ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের এই ত্রিমুখী ক্ষত উপশম করা।









