দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্ণ করলো সোনালী ব্যাংক। ১৭৩.১৩ কোটি টাকা নিয়ে পথচলা শুরু করে বর্তমান আমাতন দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ৫০ বছরে মূলধন বেড়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৮৪২.৮৭ কোটি টাকা। অনুমোদিত মূলধন ৫ ও পরিশোধিত মূলধন দুই কোটি টাকা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকটি। ১৯৭৫ সালে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৩৩২.৯৩ কোটি টাকা। আর ১৯৮২ সালে আমানত ছিল ১৫৯৬ কোটি টাকা অর্থাৎ ৭ বছরে আমানত বৃদ্ধি পায় ১২৬৩.০৭ কোটি টাকা। ১৯৮২ হতে ১৯৯২ পর্যন্ত ১০ বছরে আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ হাজার ৭২ কোটি টাকা।
১৯৯২ হতে ২০০২ সালের ১০ বছরে ১৪ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। ১৯৯২ সালে ৭৬৬৮, ২০০২ সালে ২২ হাজার ২২২ কোটি, ২০০৭ সালে ৩২৯০০ কোটি টাকা। এই ৫ বছরে ১০৬৭৮ কোটি টাকা, ২০১২ সালে ৫৯৯২৯, এই ৫ বছরে ২৭০২৯ কোটি টাকা ও ২০২১ সালে ১৩৫০১৬ কোটি টাকা আমানত আসে। সে হিসেবে গত ৯ বছরে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে।
১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, দি ব্যাংক অব বাহ্ওয়ালপুর ও দি প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডকে অঙ্গীভূত করে ৩৬৭টি শাখা নিয়ে সোনালী ব্যাংক নামে যাত্রা শুরু করে গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংকটি ৫০ বছর পূর্ণ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে ১৩৫টি শাখাকে ধ্বংস ও ৪৩টি শাখা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তান। সেখান থেকে হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগিয়েছে ব্যাংকটি। বর্তমানে বিদেশে ২টি শাখাসহ মোট শাখা দাঁড়িয়েছে ১২২৯টি।
সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকীর সভাপ্রধানের মাধ্যমে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন সোনালী প্রয়াসের মোড়ক উন্মোচন ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংকের নামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিজড়িত। আমার গভীর আস্থার প্রতীকও এই ব্যাংক। জনগণের ব্যাংক হিসেবে অবিচল দায়িত্ব পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। সবাই আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যাংক ছাড়া দেশ চলে না। ভালো কাজের কোন বিকল্প নেই। সোনালীর কাছে সবাই ভালো কিছু প্রত্যাশা করে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিপর্যস্ত প্রদেশকে দেশে পরিণত করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ যদি এগিয়ে যায় তবে পৃথিবীও এগিয়ে যাবে বলে এক সময় কটাক্ষ করা হতো। বর্তমানে বিশ্ববাসী আমাদের উন্নয়নের মডেল মানে। মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়তে হবে। আমাদের মাথাপিছু আয় ৯০০ ডলারে যেতে হলে ১৪০ বছরের টার্গেট দেয় বিশ্ব সম্প্রদায়। তবে আমরা মাত্র ৫০ বছরেই তা অর্জন করেছি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আবাসভূমি ও গরীবদের খাবার নিয়ে ভাবনা ছিল বঙ্গবন্ধুর। তাঁর সেই পথেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে। তিনি বলেন, পরিকল্পনা থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকের প্রতি বিশ্বাস করেছিলাম, আজ নিজ পায়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অন্যান্য দেশের চেয়ে ভালো আছে। প্রতিটি ব্যাংক লাভে আছে। উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ১৮ বা ২০ শতাংশ চার্জ দিয়ে কি হবে যদি লাভ না করতে পারে। ইন্টারেস্ট নির্ধারণ না করে দিলে কেউ টিকে থাকতে পারতো না।
গত ১২ বছরে তফসিলি ঋণ ১২.৩ কমে ৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০০৬ খেলাপি ১৩.২ এখন সেটি ৮.১ শতাংশ। কৃষিঋণ ৬ হাজার থেকে ৪ গুণ বেড়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এসেছে দেশের ১১ কোটি মানুষ। দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিংব্যবস্থা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে হলে ব্যাংকখাতকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখতে হবে। ২০৪১ সালে জ্ঞানভিত্তিক ২০টি দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। হবে ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত ও উন্নত দেশ।
বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এবং দেশের প্রথম অর্থ সচিব মতিউল ইসলাম।
ফজলে কবির বলেন, গ্রাহক আকর্ষণে ব্যাংকটির কোনো প্রচারের প্রয়োজন হয় না। দেশের বড় বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছে সোনালী ব্যাংক। হলমার্কের কারণে যে ক্ষতি হয়েছিল তা ২০১৮ অর্থবছরের মধ্যে শেষ হয়েছে। বলেন, আর্থিকখাতে আরো কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। যা ২০২৬ সালে গ্রাজুয়েটে কাজে লাগবে। সামাজিক নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে সোনালী। ব্যাংকখাতে করোনায় ১৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারমধ্যে ৩৩ জনই সোনালী ব্যাংকের। ব্যাংকটির আইটি সেক্টরে উন্নয়ন হয়েছে। এটি আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
ব্যাংকটির উন্নয়নে তার পরামর্শগুলো হলো- ক. গ্রাহকবান্ধবসেবা বাড়াতে হবে। গ্রাহকের প্রতি ভালো আচরণ করতে হবে। খ. ঋণপদ্ধতি সহজ করতে হবে। গ. নন ফান্ডেড বিজনেস বাড়াতে হবে। ঘ. সিএসএসে ঋণ বাড়াতে হবে। ঙ. ঋণদান ভীতি দূর করতে হবে এবং আদায় করতে হবে। চ. নিজের উন্নয়ন বাড়াতে হবে।
আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, ডিপোজিট ও কর্মকর্তাদের বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংক। জিটুপি, পিটুজি, সঞ্চয়পত্র বিক্রয়, ই-চালানে ভালো করছে সোনালী ব্যাংক। করোনাকালে অর্থ বিভাগের সঙ্গে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হয়নি। যা ইউরোপে প্রতি সপ্তাহে একটি করে ব্যর্থ হয়। এতে প্রচুর সমস্যা তৈরি হয়। তার তিনটি পরামর্শের মধ্যে রয়েছে, অটোমেশনে কাজ বাড়াতে হবে। ফিনান্সিয়াল রিচার্স সেন্টার করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
ড. আতিউর রহমান বলেন, ব্যাংক কীভাবে চলে তা শিখেছি সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তকে নয়। বঙ্গবন্ধু দেশের দায়িত্বভার নিয়ে আর্থিকসেবাখাতকে হাতে নেন। গ্রামীণ ঋণ শুরু করেন সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে। প্রান্তিক মানুষের ব্যাংকভীতি তাড়াতে কাজ করেছে সরকারি ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মুনাফায় সোনালী ব্যাংক। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব ভাণ্ডার ও আর্থিকসেবাখাত উন্নয়নে সোনালী ব্যাংক অন্যতম। আতিউর সোনালী ওয়ালেটের সুনাম করেন। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বিস্তৃতি আরো সম্প্রসারণ করলে ক্ষুদ্রসহ সব অর্থনীতি বৃদ্ধি পাবে।
ড. আতিউর আরো বলেন, মুদ্রানীতিকে মুদ্রাস্ফিতির বাইরে চিন্তা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক টেকসই উন্নয়নে কাজ করেছে বলেই বৈশ্বিক অর্থনীতি ঠিক রাখা সম্ভব হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ভিন্ন দিকে যাচ্ছে স্বীকার বলেন, রাষ্ট্রীয়সহ সব ব্যাংককে স্বচ্ছ, সুদক্ষ ও মানবিক হতে হবে।
আনন্দবাজার/শহক









