পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ‘এন’ ক্যাটাগরির জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের শেয়ার দর পাগলা হাওয়ায় উড়ছে। কোম্পানিটির শেয়ার দর বৃদ্ধির এই হাওয়ায় কোথায় যাবে, নেই তার কোনো ধারণা। শেয়ারটির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি ইতোমধ্যে সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। শেয়ারটির দর কেন বাড়ছে ব্যাখা নেই কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষের কাছে।
মাত্র ২৬ কার্যদিবসে জেএমআই হসপিটালের মোট শেয়ারের মাধ্যমে বাজার মূল্যে বেড়েছে ৮৬৭ কোটি টাকা। অপরদিকে এই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের মাধ্যমে বাজার মূল্যে বেড়েছে ৫৮৬ কোটি টাকা। বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মতিঝিলের একাধিক সিকিউরিটিজ হাউজের ১০ বিনিয়োগকারী বলছেন, জেএমআই হসপিটালের শেয়ার দর সামনে আরো বাড়বে। কেন বাড়বে, সেটা বলতে পারছেন না। তাদের ওইসব কথা শুনে অনেকেই অতি উচ্চদরে শেয়ারটি কিনছে। যদিও ওইসব কথা ভিত্তিহীন।
গত দশ বছরের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েই শেয়ার দর আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে এমন কোম্পানি ভুড়ি ভুড়ি। সময়ের পালাক্রমে সেই কোম্পানিগুলোর শেয়ার শুকিয়েও গেছে, এমন চিত্রও ভুড়ি ভুড়ি। পুঁজি নিরাপত্তা স্বার্থে বিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা সব সময় বলে আসছে বুঝে, শুনে ও বিশ্লেষণে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করতে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে পযাপ্ত পরিমাণে জ্ঞান রাখতে। কিন্তু কে শুনে কার কথা। অতি লোভে পড়ে অর্থ হারানোর গর্তে পা দিচ্ছেন অবুঝ বিনিয়োগকারী বলে জানান পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
ফাঁদ দিয়ে পুঁজিবাজার থেকে দুষ্টচক্র হাতিয়ে নিচ্ছে নিরীহ বিনিয়োগকারীদের অর্থ জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, অর্থ হাতিয়ে নেবার দুষ্টচক্রের হাত খুব লম্বা। রেগুলেটর থেকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পর্যন্ত তাদের লোকজন সাজানো রয়েছে। যেকোনো শেয়ার নিয়ে তারা খেলতে পারেন। খুব সহজেই নিরীহদের বোকা বানিয়ে চক্রটি কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে থাকে। চক্রটি এতো ধূর্ত যে, কোনো আইনে তাদের ধরা সম্ভব হয় না। কোনো কারণে ধরা পড়লেও সামান্য সাজায় মাফ পেয়ে যায়। এসব কারণে পুঁজিবাজারে পতন লেগেই থাকে।
২৬ কার্যদিবস হলো পুঁজিবাজারে লেনদেন করছে জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং শেয়ার। বর্তমানে শেয়ারটির দর আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। কারণবিহীন লাফিয়ে লাফিয়ে শেয়ারটির দর ২৬ কার্যদিবসে বেড়েছে ৬৯ দশমিক ২০ টাকা। এসময় শেয়ারটির বাজার মূলধন বেড়েছে ৮৬৭ কোটি টাকা। শেয়ার দরের এ ধরনের বৃদ্ধি নিয়ে কোম্পানির শেয়ার ধারন করা বিনিয়োগকারীদের মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যা এই কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সুখবর নয়। অপরদিক এ কোম্পানির শেয়ার দর কেন এতো বাড়ছে, তার প্রকৃত কারণ জানে না ধারন করা বিনিয়োগকারীরা।
বৃদ্ধির প্রসঙ্গে জেএমআই হসপিটালের সচিব মো. শফিকুর রহমান বলেন, শেয়ার দর বাড়ার মতো কোনো মূল্য সংবেদনশীন তথ্য নেই। যা ছিল তা হলো তৃতীয় কোয়াটারে কোম্পানিটির মুনাফা। যেটা ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। গত ৩১ মার্চ কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করেছে জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, প্রথম দিনে লেনদেন শেষে শেয়ারটির দর দাঁড়ায় ২২ টাকায়। সেই দর বর্তমানে ৯১ টাকা ওঠে এসেছে। কেন এতো দরে শেয়ারটি কিনছে, সেটা কেবল বিনিয়োগকারীরাই বলতে পারবে।
পুঁজিবাজারে আমাদের (জেএমআই হসপিটাল) কেউ (পরিচালক) শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করে না জানিয়ে তিনি বলেন, শেয়ার দর বাড়া কমা নিয়ে আমাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। কোম্পানিটিটির পরিচালকরা খুবই স্বচ্ছ। এসব কাজ করবে না। এর বেশি আর কিছু বলতে পারবো না। এদিক শেয়ার দর ধারাবাহিকভাবে বাড়ার কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক কর্মকর্তা বলেন, জেএমআই হসপিটালের শেয়ার দর নিয়ে কাজ করছি। দর বাড়ার কারন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অতি দরের ব্যপারে প্রয়োজনে জেএমআই হসপিটালকে নোটিশ পাঠাবো। প্রয়োজনে জরুরি ব্যবস্থাও নিবো।
শেয়ার দর বৃদ্ধির একই বিযয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, পুঁজিবাজারের কোনো কোম্পানির শেয়ার দর বাড়লো বা কমলো, সেটা আমাদের বিবেচ্য নয়। আমরা দেখি শেয়ার দর বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা। সেই হিসেবে জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের শেয়ার দর বাড়ার বিযয়টি আমাদের নজরে রয়েছে।
৭০ টাকা ওপরে আসার পর কোম্পানিটি শেয়ার দরের বিযয়টি খতিয়ে দেখছি জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, সাধারণত নতুন কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি থাকে। ফলে এ ধরনের কোম্পানির শেয়ার দর বাড়তে পারে। এটা আমরা জানি। আমরা খতিয়ে দেখছি, জেএমআই হসপিটালের শেয়ার দর বাড়ার পেছনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা। শেয়ারটির দর বাড়ানো ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেলে, কেবল সেই ক্ষেত্রে কোম্পানির বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, লেনদেন শুরু পর থেকে জেএমআই হসপিটালের শেয়ার দর শুধুই বাড়ছে। শেয়ার দর বেড়ে ৯১ টাকার ওপরে চলে এসেছে। কোনো কারণ বা কোনো পরিকল্পনায় শেয়ার দর এভাবে বেড়েছে তার কারণ জানা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। নিয়ম অনুসারে কোম্পানির কর্মকর্তারা শেয়ার দর বাড়া-কমার পেছনে কাজ করে না জানিয়ে তারা বলছেন, এটা আমরা জানি। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোম্পানির শেয়ার দর বাড়া-কমার তাদের (কর্মকর্তা) অদৃশ্য ছোঁয়া থাকে। তাদের ছোঁয়া ছাড়া কোনো কোম্পানির শেয়ার দর লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যায় না। কারণ তারাই জানেন কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য। যেসব তথ্য শেয়ার বাড়া-কমার ক্ষেত্রে জাদুকরি ভূমিকা রাখে। তাই শেয়ার দর বাড়ার জাদুকরি প্রতিষ্ঠান জেএমআই হসপিটালের প্রতি বিশেষ নজর দিতে পুঁজিবাজার রেগুরেটরকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার জেএমআই হসপিটালের শেয়ার দর দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ২০ টাকা। এর আগে ৩১ মার্চ কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ২২ টাকা। মাত্র ২৬ কার্যদিবস বা গত দেড় মাসে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৬৯ দশমিক ২০ টাকা। কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ১২ কোটি ৫২ লাখ ৯৪ হাজার ১২০টি। সেই হিসাবে গত বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির মোট শেয়ারের বাজার মূল্যে হয় ১ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ৭৪৪ টাকা। গত ৩১ মার্চ শেয়ারের বাজার মূল্যে ছিল ২৭৫ কোটি ৬৪ লাখ ৭০ হাজার ৬৪০ টাকা। এই সময়ের ব্যবধানে কোম্পানিটির মোট শেয়ারের বাজার মূল্যে বেড়েছে ৮৬৭ কোটি ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১০৪ টাকা।
জেএমআই হসপিটালের মোট শেয়ারের মধ্যে ৩০ দশমিক ৫৮ শতাংশ ধারন করেছে সাধারন বিনিয়োগকারী। ৩৭ দশমিক ১০ শতাংশ ধারন করেছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। সেই হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের বাজার মূল্যে বেড়েছে ৫৮৬ কোটি ৮০ লাখ ৯৪ হাজার ৯৮০ টাকা। এ ধরনের বৃদ্ধি কোনো মতে মানতে রাজি নন বিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা। তাই শেয়ার দর কমার কারণ জানার জন্য সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ১৫ পয়েন্ট ছাড়ালেই তা বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) মার্জিন ঋণের যোগ্যতা হিসেবে সর্বোচ্চ ৪০ পিই রেশিও বেঁধে দিয়েছে। এ হিসেবে ৪০ পর্যন্ত পিইধারীর শেয়ার বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ বলে জানান বিএসইসি। সেই হিসাবে গত বৃহস্পতিবার জেএমআই হসপিটালের (অডিটেড রিপোর্ট) পিই রেশিও দাড়ায় ৫০ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট। মানে পিই রেশিও হিসাবে, বিনিয়োগ নিরাপদ অবস্থানে নেই।
ডিএসইর সূত্রে জানা যায়, জেএমআই হসপিটালের তিন কোয়াটারে (জানুয়রি-মার্চ ২০২২) শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ২ দশমিক ৮৯ টাকা। তৃতীয় কোয়টারে শেয়ার প্রতি সম্পদ (এনএভিপিএস) দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬৯ টাকা। নগদ প্রবাহ ২ দশমিক ৩৮ টাকা। জুন ২০২১ সাল হিসেবে, কোম্পানিটির স্বল্পমেয়াদে ১০৬ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদে ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার লোন রয়েছে। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং রিজার্ভ ১০৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা ১২ কোটি ৫২ লাখ ৯৪ হাজার ১২০টি। কোম্পানিটি মোট শেয়ারের ৩২ দশমিক ৩২ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালক একাই ধারন করেছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ৩৭ দশমিক ১০ শতাংশ ও সাধারন বিনিয়োগকারী ২০ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার ধারন করেছে।
আনন্দবাজার/শহক









