বিদায়ী সপ্তাহে (রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার) পুঁজিবাজারে পুঁজি হারানোর রাস্তা আরও প্রশস্ত হয়। হারানোর কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ প্রতি নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারী। সপ্তাহে অস্বাভাবিকহারে কমেছে পুঁজিবাজার মূলধন। পতন হয় সব ধরনের সূচকে। ৯০ ভাগ কোম্পানির শেয়ার দরে পতন। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে চলছিল অস্থিরতা। হারানোর বৈরী পরিবেশ থেকে বাঁচতে রেগুলেটরদের কার্যকর পদক্ষেপ চান বিনিয়োগকারীরা।
চলতি বছরের শুরুর দিকের উত্থানে সবাইকে পুঁজিবাজারে প্রতি বিনিয়োগ আগ্রহী করে তুলেছিল জানিয়ে বিনিয়োগকারীরা বলেন, সেই আগ্রহে নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করেছিল অনেকেই। কিন্তু মন্দায় সেই বিনিয়োগ এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্দা পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে রেগুলেটররা (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসি) বলেন, চলতি বছরের শুরুতে লেনদেনসহ সূচক অতি বেড়ে যায়। বাড়ে পুঁজিবাজার মূলধনও। এসময় পুঁজিবাজারে শেয়ারগুলোর দর বেড়েছিল অতিরিক্ত। পরের কয়েক সপ্তাহ অতি দরের কিছুটা লাগাম পড়েছিল। তখন শেয়ার দর কমতে থাকে। পরে কয়েক সপ্তাহ বাড়া-কমার মধ্যে কেটে যায়। এরপর হঠাৎ করেই কয়েক সপ্তাহ পুঁজিবাজারের সব দিকেই মন্দা। এ ধরনের মন্দাকে কারেকশন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারেকশনের পর সামনে পুঁজিবাজার ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কবে ঠিক হবে বা কতোটা পতন পর ঠিক হবে নেই সেই ক্ষনটি বলেনি।
পতন প্রসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বলেন, মন্দায় পুঁজিবাজার মুখ থুবড়ে পড়েছে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা বাড়ছে। এটি বাড়তে দেয়া যাবে না। শিগগিরই বিনিয়োগ অনাস্থা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজার প্রতি আস্থা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে রেগুলেটরদের কঠোর হবার পরামর্শ দেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূত্রমতে, গত বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে ডিএসইর পুঁজিবাজারের মূলধন দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৯ হাজার ৮৭২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এক সপ্তাহে আগে বা ১২ মে মূলধন ছিল ৫ লাখ ৩১ হাজার ১২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অপরদিকে, গত বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে সিএসইর পুঁজিবাজারের মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। গত ১২ মে মূলধন ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। গেল সপ্তাহে ডিএসইতে মূলধন কমেছে ২১ হাজার ১৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সিএসইতে মূলধন কমেছে ১৯ হাজার ৬৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
চলতি বছরের প্রথম তিন সপ্তাহ (১৫ কার্যদিবস) কারণবিহীন বেড়ে উঠেছিল পুঁজিবাজার মূলধন। হঠাৎ করেই এরপরের দুই সপ্তাহ (১০ কার্যদিবস) মূলধন কমতে দেখা গেছে। তাল মিলিয়ে বছর শুরুর তিন সপ্তাহে লেনদেন উত্থানে চমক থাকলেও এরপর দুই সপ্তাহে লেনদেন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। পরের সপ্তাহে মূলধন বৃত্ত বেড়েছিল। সেখান থেকে পরের সপ্তাহগুলোতে মূলধন বাড়া-কমার মধ্যে ছিল। কিন্তু গেল সপ্তাহে মূলধন কমার গতি অস্বাভাবিক ছিল। সপ্তাহটিতে দুই স্টকের মিলে (ডিএসই ও সিএসই) মূলধন কমেছে ৪০ হাজার ২০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএসইতে মূলধন কমেছে ২১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা এবং সিএসইতে ১৯ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এ ধরনের কমাকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন। এতো কমার পেছনে কারন রেগুলেটরদের খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, পুঁজিবাজারে মূলধন বাড়া-কমা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অতিরিক্ত বৃদ্ধি যেমন ভালো লক্ষ্মণ না, তেমনি কমাও নয়। সব ক্ষেত্রেই বাড়া-কমার একটা সীমা থাকে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করে, সেই ক্ষেত্রে সবার মনে অনেকগুলোর প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব প্রশ্নের পরিষ্কার ও যৌক্তিক জবাব জানা থাকলে, সেটা অন্য কথা। না জানা থাকলে সেই ক্ষেত্রে বিযয়টি ভালো চোখে দেখার কথা না কেউ।
এদিকে, বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর পুঁজিবাজারের সব ধরনের সূচক পতনে লেনদেন শেষ হয়। এক সপ্তাহে ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩০৭ দশমিক ২২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৫৮ দশমিক ২৫ পয়েন্টে। এছাড়া ডিএসই৩০ সূচক ৯০ দশমিক ২৪ পয়েন্ট এবং শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৪৯ দশমিক ১৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩১৬ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ৩৮৩ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্টে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৮০৮ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৩৯ দশমিক ৭২ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসই৫০ সূচক ৪৬ দশমিক ৪২ পয়েন্ট, সিএসই৩০ সূচক ৪৮৯ দশমিক ১৮ পয়েন্ট, সিএসসিএক্স সূচক ৪৮৫ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট এবং সিএসআই সূচক ৪০ দশামক ৯৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৩৭৫ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে, ১৩ হাজার ৩৭৩ দশমিক ৫০ পয়েন্টে, ১১ হাজার ৬৪ দশমিক ৬৯ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ১৭২ দশমিক ৮৯ পয়েন্টে।
গেল সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩ হাজার ২৩৫ কোটি ৭৩ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৫ টাকা। আগের সপ্তাহে লেনদেন ছিল ৫ হাজার ৩৯৭ কোটি ৯৩ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ৪০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অপরদিকে গেল সপ্তাহে সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১২১ কোটি ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৫ টাকা। সপ্তাহে লেনদেন ছিল ১৬৬ কোটি ৯৭ লাখ ৮৭ হাজার ৫৮৯ টাকা।
গেল সপ্তাহে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৯৩টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ২০টির, দর কমেছে ৩৬০টির বা ৯১ দশমিক ৬০ শতাংশ ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৬টির কোম্পানির। লেদনের হয়নি সাত কোম্পানির শেয়ার। সপ্তাহে সিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৫৩টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৩৪টির, দর কমেছে ৩১২টির বা ৮৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৫টির কোম্পানির।
গেল সপ্তাহে ডিএসইতে ৩ হাজার ২৩৫ কোটি ৭৩ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৫ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। ওই সময় এ ক্যাটাগরির ২ হাজার ৪১ কোটি ৮৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা, বি ক্যাটাগরির ৮২৮ কোটি ২৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, এন ক্যাটাগরির ১৮৯ কোটি ২২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ও জেড ক্যাটাগরির ৩৭ কোটি ২৫ লাখ ৯ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে।
গেল সপ্তাহে সিএসইতে ১২১ কোটি ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৫ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। ওই সপ্তাহে সিএসইতে এ ক্যাটাগরির ৬৩ কোটি ৪৪ লাখ ৬ হাজার ৭৮৫ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। ওই সময় বি ক্যাটাগরির ৩৮ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩০ টাকা, এন ক্যাটাগরির ১৮ কোটি ৪৪ লাখ ৬২ হাজার ৪২৮ টাকা ও জেড ক্যাটাগরির ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ২৯১ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক









