যেতে চায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ে
অভিযুক্ত আব্দুল হাই বাচ্চুর বিদায়ের পর ব্যাংকটিকে ৩৩৯০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। এরপরও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূলধন ঘাটতি ২৩৫৩ কোটি টাকা।
কর্মীদের বেতন কমানের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে নেয়া নানা উদ্যোগেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না ধুঁকতে থাকা বেসিক ব্যাংক। বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের কারণে নতুন করে গ্রাহক টানতেও পারছে না। এখন সংকট কাটাতে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর চায় ব্যাংকটি। প্রস্তুতির জন্য ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মুনাফায় থাকা ব্যাংকটি ২০১৩ সালে প্রথম ৫৩ কোটি টাকা লোকসান দেয়। এরপর ২০২০ সাল পর্যন্ত গত আট বছরে লোকসান দিয়েছে তিন হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে লোকসান হয়েছে আরও ৪০০ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা খেলাপি। যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে তিন হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা।
কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর বিদায়ের পর সরকার থেকে ব্যাংকটিকে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এরপরও গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূলধন ঘাটতি রয়েছে দুই হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। শরিয়াহ ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর বিষয়ে কমিটি গঠনের কারণ হিসেবে ব্যাংকের নথিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো থাকলেও সরকারি মালিকানাধীন পূর্ণাঙ্গ কোনো ইসলামী ব্যাংক নেই। এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেসিক ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে চায়।
ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুর রহিমকে আহ্বায়ক এবং দুই ডিএমডি নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ ও আবু মো. মোফাজ্জেলকে সদস্য করে করে গত ১৬ নভেম্বর কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া প্রধান কার্যালয়সহ সব মহাব্যবস্থাপককে কমিটির সদস্য করা হয়েছে। ব্যাংক গঠিত কমিটির কার্যপরিধিতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার কথা বলা হয়েছে।
প্রথমত, প্রচলিত ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর হয়েছে এ রকম অন্তত তিনটি ব্যাংকের তথ্য নিতে হবে। সে আলোকে বেসিককে শরিয়াহভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব নির্ণয় করতে হবে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি লাগবে, রিপোর্টে তা উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের জন্য বেসিক ব্যাংকে কী পরিবর্তন আনতে হবে, তার বিস্তারিত জানাতে হবে। ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকে কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রথমে তা পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটিতে উত্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদনের পর নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে উত্থাপন করা হবে। এরপর সুপারিশসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছে অনেক ব্যাংক। চলতি বছর স্ট্যান্ডার্ড ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহ ব্যাংকে রূপান্তর হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক রয়েছে। এর বাইরে প্রচলিত ধারার ৯টি ব্যাংকের ৪০টি ইসলামী শাখা এবং ১৩টি ব্যাংকের ১৯৪টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে। মুনাফা, রেমিট্যান্স, আমদানি-রফতানি ব্যবসাসহ অন্যসব দিক থেকেই প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি বেশি।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ব্যাংকটির ভাবমূর্তির সমস্যা আছে। একটি পরিবর্তন হলে সবার মাঝে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে। তবে ব্যাংকটির মালিক যেহেতু সরকার, সুতরাং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারই নেবে। তারা বোঝার চেষ্টা করছেন, অন্যরা কীভাবে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিছু ঋণ আছে আদায় অযোগ্য। যেসব ঋণ আদায় করা সম্ভব তাদের মাঝে একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে হবে। ফলে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে।
আনন্দবাজার/শহক









