জাতীয় সংসদে ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে দেশের ব্যাংক খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এই আইনের ফলে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা মোকাবিলায় একীভূত করা পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় আগের মালিকদের হাতে ফেরার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে পূর্বে জারি করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের সেই বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে, যেখানে ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মালিকানায় ফেরার সুযোগ ছিল না। নতুন এই আইনের ফলে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম ও নাসা গ্রুপের মতো পক্ষগুলোর জন্যও আবারও ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে ফেরার পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
নতুন আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো তফসিলি ব্যাংক রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় গেলে আগের শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পুনরায় ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে একাধিক কঠোর শর্ত মানতে হবে। আবেদনকারীদের সরকারের বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব আর্থিক সহায়তা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি নতুন মূলধন জোগান দিয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণ করতে হবে এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারী ও পাওনাদারদের সব দায় পরিশোধের পরিকল্পনা থাকতে হবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের বিনিয়োগ করা অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রথমে জমা দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই শেষে সরকারের অনুমোদন নেবে। অনুমোদনের পর আগের মালিকদের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফেরত পেতে এসব শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক থাকবে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক পুনর্গঠিত ব্যাংকের কার্যক্রম দুই বছর তদারকি করবে। এ সময় শেষে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পূরণ হয়েছে কি না তা যাচাই করা হবে। কোনো ধরনের ব্যর্থতা পাওয়া গেলে অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করা যাবে এবং সে অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে অর্থনীতিবিদ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, কঠোর আর্থিক নিশ্চয়তা ছাড়া শুধু অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে মালিকানা ফেরানো হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং পূর্ববর্তী দায়ী পক্ষগুলো সহজেই আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এই বিধানকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এটি কার্যত ব্যাংক ধ্বংসের জন্য দায়ীদের পুরস্কৃত করার মতো একটি ব্যবস্থা। তার মতে, যারা অতীতে অনিয়ম ও অতিরিক্ত ঋণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করেছে, তাদের আবার সুযোগ দেওয়া জবাবদিহিতার ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, মালিকদের অর্থের উৎস নিশ্চিত না থাকলে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবারও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, যা চলমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
অন্যদিকে সংসদে এই বিলের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বলেন, এই আইন আমানতকারীদের স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাদের মতে, অতীতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করা হলেও নতুন কাঠামোতে আমানতকারীদের সুরক্ষা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
বিরোধিতার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তাই বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমেই ব্যাংকগুলোকে কার্যকর রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে জারি করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের আওতায় এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। এই ব্যাংকের জন্য মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
নতুন আইন কার্যকর হলে এই একীভূত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানা পুনরায় আগের শেয়ারহোল্ডারদের হাতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে বড় ধরনের আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।









