তিন মাস ভাটার পর বিক্রিতে জোয়ার
- এক মাসেই বিক্রি বৃদ্ধি ৩৫ ভাগ
- বেড়েছে নিট ঋণের পরিমাণও
গেল বছরের ডিসেম্বরে সরকার যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে তার চেয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করেছে বেশি। যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি
সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে গেলে সুদহার কম হয়। সঞ্চয়পত্রের সুদ হার বেশি। গত কয়েক মাস সরকার এ খাতে ঋণ হার কমিয়েছে যা ভালো দিক: ড. আহসান এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই
নতুন মুনাফার রেট নির্ধারণের পর কমতে শুরু করলেও ফের বেড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি বেড়েছে নিট ঋণের পরিমাণও। এতে টানা তিন মাস ভাটার পর সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও নিট ঋণে ফিরেছে সুবাতাস। গত বছরের ডিসেম্বরে সরকার যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে তার চেয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করেছে বেশি। যা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের আগস্টে নতুন করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নির্ধারণের পর অক্টোবর থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও নিট ঋণ কমেছিল। নতুন বছরে অনেকের ব্যাংকের এফডিআরের মেয়াদ শেষে হয়েছে। গ্রাহক সেই টাকা তুলে নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনেছে। এতে এক মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এছাড়া গত ডিসেম্বরে সরকার অতিরিক্ত পরিশোধ করেছে ৪৩৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক মাস পর সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে দুই হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের আগস্টে সরকারের সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬২৮ কোটি টাকা। এক মাস পর সেপ্টেম্বরে নিট ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে ২৮২৫ কোটি টাকা, অক্টোবরে এসে ব্যাপক কমে নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৬৬ কোটি টাকা। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিলো নভেম্বরেও। নভেম্বরে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এসে একটাও নিট ঋণ না নিয়ে পরিশোধ বেশি করেছে ৪৩৬ কোটি টাকা। তবে নতুন বছরে নিট ঋণ বেড়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে গেলে সুদহার কম হয়। সঞ্চয়পত্রের সুদ হার বেশি। গত কয়েক মাস সরকার এ খাতে ঋণ হার কমিয়েছে এটা ভালো দিক। আমি মনে করি সরকারের উচিত হয় এ খাত থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়ানো।
সঞ্চয় অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের সুদহার কমানোর ফলে গত কয়েক মাসে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে ২০২২ সালের শুরুতে গ্রাহকের যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে আমার মনে হয় আরও বিক্রি বাড়বে। অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানত রেখেছিল, বছরের শেষে সেই টাকা নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় তুলে ফেলেছে। গ্রাহক নতুন করে সেগুলো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছে।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে এক শতাংশ এবং ৩০ লাখ থেকে ৪৫ লাখ টাকা বা এর বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয় সরকার। এরপরের মাস থেকেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমতে শুরু করে।
সেপ্টেম্বরে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ এসেছিল ১১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ নেমে আসে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকায়। নভেম্বরে কিছুটা বেড়ে মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে ফের কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার কোটি টাকায়। তবে জানুয়ারিতে এসে তা অনেকটা বেড়ে ৯ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকার বিক্রি হয়।
তথ্যমতে, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্রে মোট বিনিয়োগ আসে ৬১ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। ওই সময় পুরনো সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধে সরকার ব্যয় করে ৪৯ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। ফলে এই সাত মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ১২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। সেই হিসেবে অর্থবছরের সাত মাসে সঞ্চয়পত্রের লক্ষ্যমাত্রার ৩৮ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নীট ঋণ এসেছিল ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। তবে এ খাতের ঋণ বাড়তে থাকায় ওই অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে সঞ্চয়পত্রের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু ওই লক্ষ্যমাত্রারও বেশি ঋণ আসে অর্থবছর শেষে।
গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় খুবই কম হলেও চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর প্রথম ছয় মাসে ঋণ নিয়েছে ৩৩ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে আগের ঋণের পরিশোধ ছিল ১৪ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা।









