বিদায়ি সপ্তাহে (রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার) দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও অপর পুঁজিবাজার চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সবধরনের সূচক, লেনদেন এবং মূলধন বেড়েছে। এসময় বেড়েছে ৫৯ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর।
গেল সপ্তাহে পুঁজিবাজারে মূলধন বেড়েছে ৮ হাজার ৫২৪ হাজার ১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএসইতে মূলধন বেড়েছে ৪ হাজার ৫৭০ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং সিএসইতে ৩ হাজার ৯৫৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। যা আগের সপ্তাহে মূলধন কমেছিল ১ হাজার ৭৭৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিএসইতে মূলধন কমেছিল ৭২০ কোটি ২৩ টাকা এবং সিএসইতে ১ হাজার ৫৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
বছরের শুরুর প্রথম তিন সপ্তাহ (১৫ কার্যদিবস) পুঁজিবাজারে মূলধনের চমক থাকলেও এরপরের দুই সপ্তাহ (১০ কার্যদিবস) পতনে নেমে এসেছে। বছরের প্রথম তিন সপ্তাহে কারণবিহীন বেড়ে উঠেছিল পুঁজিবাজার মূলধন। হঠাৎ করেই এরপর দুই সপ্তাহে মূলধন কমতে দেখা গেছে। তাল মিলিয়ে বছর শুরুর তিন সপ্তাহে লেনদেন উত্থানে চমক থাকলে এরপর দুই সপ্তাহে লেনদেন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। কিন্তু গেল সপ্তাহে সেই মূলধন বৃত্ত ফের বাড়ছে।
পুঁজিবাজারে মূলধন বাড়া-কমা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অতিরিক্ত বৃদ্ধি যেমন ভালো লক্ষ্মণ না, তেমনি কমাও নয়। সব ক্ষেত্রেই বাড়া-কমার একটা সীমা থাকে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করে, সেই ক্ষেত্রে সবার মনে অনেকগুলোর প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব প্রশ্নের পরিষ্কার ও যৌক্তিক জবাব জানা থাকলে, সেটা অন্য কথা। না জানা থাকলে সেই ক্ষেত্রে বিজ্ঞরা বিযয়টি ভালো চোখে দেখে না।
চলতি বছরের শুরুর প্রথম ১৫ কার্যদিবস পুঁজিবাজরের দুই স্টকের মূলধন বেড়েছিল ৪৭ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। মূলধনের এ ধরনের বৃদ্ধিকে বাঁকা চোখে দেখেছিলেন অনেকেই। এই বৃদ্ধির কারণে নানান ধরনের প্রশ্ন জন্ম দিয়েছিলো। অনেকেই মনে করেছিলেন পুঁজিবাজারে থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে খারাপ চক্রদের নতুন কৌশল। এসব কারণে অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত ছিলেন। বিরত থাকার পর গত দুই সপ্তাহ বা ১০ কার্যদিবস পুঁজিবাজরের দুই স্টকের মূলধন কমেছিল ৬ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা।
এরপরই গেল সপ্তাহে (৫ কার্যদিবস) দুই স্টকের মূলধন বেড়েছে ৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। দুই সপ্তাহে মূলধন কমার পরে গেল সপ্তাহে পুঁজিবাজরে মূলধন এ ধরনের বাড়া স্বাভাবিক নিয়মে হয়েছে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা আরো বলছেন, চলতি বছরের শুরু থেকে পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে সূচকসহ লেনদেন উত্থান ক্ষেত্রে চমক। কেন দেখাচ্ছে তার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। হতে পারে গত বছরের শেষদিকের মন্দা পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে সব ধরনের বিনিয়োগকারীরা।
এ কারণে তারাই নতুন বছরে পুঁজিবাজার উত্থান ঝলক ছিল। তাই বছরের শুরুর প্রথম তিন সপ্তাহে পুঁজিবাজার উত্থান ছিল। তবে উত্থানের একটা লাগাম থাকে। সেটা অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হাত থেকে রক্ষা করে। এরপর সেই ধারায় দুই সপ্তাহে পুঁজিবাজারে উত্থানের পথ কিছুটা বাধা হয়েছে। সেই বাধা কাটিয়ে বিদায়ি সপ্তাহে ফের উত্থানে ফিরেছে পুঁজিবাজার। সবমিলিয়ে এরপরও পুঁজিবাজারে অতি দামে শেয়ার ক্রয় করা থেকে বিরত সহ লোকসানে শেয়ার বিক্রয় না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুঁজিবাজার ওভার-ভ্যালুড হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট অনেকের এমন মন্তব্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, ডিএসইর পুঁজিবাজার মুলধন ৩ লাখ কোটি টাকা থেকে সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকায় ওপরে উন্নীত হয়েছে। এতে বাজারের মূলধন আকার বড় হয়েছে। বাজার আরো বড় হবার জরুরী। কিন্তু অনেকে এই বাজারকে ওভার-ভ্যালুড বলে মনে করছেন, যা ঠিক নয়।
ঢাকা ও চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই ও সিএসই) সূত্র মতে, গত বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) লেনদেন শেষে ডিএসইর পুঁজিবাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এক সপ্তাহে আগে বা ৩ ফেব্রুয়ারি মূলধন ছিল ৫ লাখ ৬২ হাজার ১৮২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এই সময়ের ব্যবধানে ডিএসইর পুঁজিবাজার মূলধন বেড়েছে ৪ হাজার ৫৭০ কোটি ২২ লাখ।
গত বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) লেনদেন শেষে সিএসইর পুঁজিবাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৯৫ হাজার ১৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ৩ ফেব্রুয়ারি মূলধন ছিল ৪ লাখ ৯১ হাজার ৬৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এই সময়ের ব্যবধানে সিএসইর পুঁজিবাজার মূলধন বেড়েছে ৩ হাজার ৯৫৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে (ডিএসই ও সিএসই) মূলধন বেড়েছে ৮ হাজার ৫২৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
এদিকে, বিদায়ী সপ্তাহে উভয় পুঁজিবাজারের সব ধরনের সূচক উত্থানে লেনদেন শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহে ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬২ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৫ দশমিক ৯৫ পয়েন্টে। আর ডিএসই৩০ সূচক ৫ দশমিক ১৫ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯৭ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে। এছাড়া শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ১৩ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫১৭ দশমিক ৬২ পয়েন্টে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ১৯৩ দশমিক ১১ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৭৬৯ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসই ৫০ সূচক ৯ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট, সিএসই৩০ সূচক ২৬৬ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট, সিএসসিএক্স সূচক ১১২ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট এবং সিএসআই সূচক ৮ দশামক ৯৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৫২৯ দশমিক ৩৪ পয়েন্টে, ১৪ হাজার ৭০৮ দশমিক ৪১ পয়েন্টে, ১২ হাজার ৪৭২ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ২৮৯ দশমিক শূন্য ২ পয়েন্টে।
গেল সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ৬১৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে লেনদেন ছিল ৬ হাজার ৪২৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ১৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অপরদিক গেল সপ্তাহে সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৮৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে লেনদেন ছিল ২৩৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৫০ কোটি ১ লাখ টাকা।
গেল সপ্তাহে দুই পুঁজিবাজারে বেড়েছে ৫৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর। কমেছে ৩৩ দশমিক ১৮ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর। এই সপ্তাহে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৯২টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ২৩৫টির, দর কমেছে ১২৫টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টির কোম্পানির। লেদনের হয়নি ছয় কোম্পানির শেয়ার। সপ্তাহে সিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৪৫টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ২০৩টির, দর কমেছে ১১৯টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৩টির কোম্পানির।
গেল সপ্তাহে ডিএসইতে এ ক্যাটাগরির ৫ হাজার ২২৩ কোটি ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। ওই সময় বি ক্যাটাগরির ৯৯৮ কোটি ৮৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, এন ক্যাটাগরির ১৮৩ কোটি ৩০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ও জেড ক্যাটাগরির ৪৭ কোটি ২৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। ওই সপ্তাহে সিএসইতে এ ক্যাটাগরির ২০৫ কোটি ২ লাখ ১৫ হাজার ৮৯০ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। ওই সময় বি ক্যাটাগরির ৪৯ কোটি ৬৮ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৬ টাকা, এন ক্যাটাগরির ২৮ কোটি ৫৬ লাখ ৯৬ হাজার ৭৫৯ টাকা ও জেড ক্যাটাগরির ১ কোটি ৪৯ লাখ ১৩ হাজার ৭৩৮ টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে।
আনন্দবাজার/শহক









