যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্বল্পমেয়াদী ১৫ শতাংশ শুল্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। পাঁচ মাস পর এই শুল্ক হার বাড়বে, কমবে নাকি প্রত্যাহার করা হবে—এমন ধোঁয়াশার কারণে নতুন করে বড় কোনো ক্রয়াদেশ বা দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন মার্কিন ক্রেতারা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত এই শুল্ক নীতি কেবল নতুন আদেশের পথই রুদ্ধ করেনি, বরং পাইপলাইনে থাকা বা আগে দেওয়া আদেশের মূল্য নিয়েও নতুন করে দর কষাকষির জটিলতা তৈরি করেছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, ক্রেতারা এখন মূলত 'পর্যবেক্ষণ' মোডে আছেন। চূড়ান্ত শুল্ক কাঠামো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তারা দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা করতে পারছেন না। একই শঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ। তার মতে, জুন পর্যন্ত তাদের হাতে কাজের অর্ডার থাকলেও পাঁচ মাস পরের পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশের গন্তব্য এই মার্কিন বাজার, ফলে বর্তমানের এই স্থবিরতা রপ্তানি আয়ে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
বিকেএমইএ-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ক্রেতারা এখন শুধু জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নামমাত্র পরিমাণের অর্ডার দিচ্ছেন। এদিকে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, মার্কিন বাণিজ্য নীতির এই ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকি বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্ট আগের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বাতিল করার পর প্রশাসন দ্রুত নতুন আইনি কাঠামোতে এই শুল্ক আরোপ করেছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৮.১৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা তাদের মোট বৈশ্বিক সোর্সিংয়ের ১১ শতাংশ। শুরুতে এই শুল্ক হার ৩৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও আলোচনার মাধ্যমে তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, সব দেশের জন্য যদি অভিন্ন ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, তবে চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের যে বাড়তি সুবিধা ছিল তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আগে বেশি শুল্কের কারণে চীন থেকে যেসব ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছিল, এখন তা আবারও চীনে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশ হওয়ায় মার্কিন ক্রেতারা এখন উল্টো রপ্তানিকারকদের ওপর পণ্যের দাম কমানোর চাপ দিচ্ছেন। ওটেক্সা (Otexa) থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, অনেক ক্রেতা ইতোমধ্যে জাহাজীকরণের অপেক্ষায় থাকা পণ্যের ওপর ২ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য ছাড় দাবি করেছেন। একটি মাঝারি মানের মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ইমেইল বার্তায় দেখা গেছে, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স না হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে তারা এই দাম কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। বায়িং হাউসগুলো বলছে, এই বাড়তি চাপের বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদের বা উৎপাদনকারীদেরই বহন করতে হবে, যা মুনাফার মার্জিনকে আরও সংকুচিত করবে। এই ত্রিমুখী সংকটে পড়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত এখন ওয়াশিংটনের পরবর্তী বার্তার অপেক্ষায় দিন গুনছে।









