রপ্তানিখাত-------
- পাঁচ দশকে রপ্তানি কমেছে ৮৭ ভাগ
- পাটের জায়গায় পোশাক-ওষুধশিল্প
নব্বই দশকে বিশ্বব্যাংকের পাটখাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ১১টি পাটকল বন্ধ, বিক্রি ও একীভূত করা হয়। ২০০২ সালে বন্ধ হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ আদমজী ও এবিসি মিল। এরপর বিজেএমসির ২৬টি পাটকলের মধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল ২৫টি। ইতোমধ্যে সরকার পাটকলগুলো ভাড়াভিত্তিক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশকে একসময় সোনালি আঁশের দেশ বলা হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রধান অর্থ উপার্জনকারী ফসল ছিল পাট। অথচ গত পাঁচ দশকে অনেকটাই ম্লান হয়েছে পাটের অবস্থান। রপ্তানি আয়েও পাটের অবদান নেমেছে তলানিতে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের অংশীদারত্ব ছিল ৮৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সে বছর মোট রপ্তানি আয় ছিল ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে শুধু পাট রপ্তানি ৩১ কোটি ডলারের বেশি। কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছিল ১৩ কোটি ডলারের এবং পাটজাত পণ্য ছিল ১৮ কোটি ডলারের।
এদিকে গত অর্থবছর (২০২০-২১) পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১১৬ কোটি ১৪ লাখ ডলার। এ পাঁচ দশকে দেশের সার্বিক রপ্তানি আয় ঠেকেছে ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলারে। যেখানে পাটের অবদান মাত্র ২ দশমিক ৯৯ ভাগ। অর্থাৎ পাঁচ দশকে পাট রপ্তানির আর্থিক মূল্য বাড়লেও মোট রপ্তানিতে পাটের অবদান প্রায় ৮৭ ভাগ কমে গেছে। সে জায়গা দখল করেছে পোশাক, ওষুধসহ অন্যান্য পণ্য।
এ সময়ে একে একে থেমে গেছে বেশির ভাগ পাটের কল। ১৯৭২ সালে দেশে ৭৮টি পাটকল নিয়ে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে আশির দশক পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প ছিল এটি। সে সময় বিজেএমসি জনবলের দিক থেকে দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যেখানে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক এবং সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি নিযুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আয়ের দিকেও এ শিল্প ছিল শীর্ষে।
পরবর্তী ১৯৮১ সালে সংস্থাটির মিলের সংখ্যা বেড়ে হয় ৮২টি। এরপর থেকে লোকসানে পড়তে থাকে মিলগুলো। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের সময় ৩৫টি পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। আটটি পাটকলের পুঁজি প্রত্যাহার করা হয়।
১৯৯০ সালের পর বিশ্বব্যাংকের পাট খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় ১১টি পাটকল বন্ধ, বিক্রি ও একীভূত করা হয়। ২০০২ সালের জুনে বন্ধ হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ আদমজী জুট মিল এবং এবিসি মিল। এরপর বিজেএমসির অধীনে থাকা ২৬টি পাটকলের মধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল ২৫টি। এগুলোর মধ্যে ২২টি পাটকল ও তিনটি ননজুট কারখানা। ইতোমধ্যে সরকার পাট মিলগুলো ভাড়াভিত্তিক ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মিল বন্ধ থাকায় পাটের জমির পরিমাণও কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে ৭৭ লাখ টন কাঁচা পাট উৎপাদিত হয়েছে। দেশে মাত্র সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমিতে এখন পাটের আবাদ হয়। যেখানে কয়েক বছর আগেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার টন পাট উৎপাদন হয়েছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে (২০২০-২১) যেখানে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) শুরু থেকেই দেশের পাট রপ্তানি খাত গতি হারিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম সাত মাস (জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত) পাট পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৯ শতাংশ। ওই সাত মাসে পাট পণ্য থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৬৯৬ মিলিয়ন ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৬৬ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে গতকাল পালিত হয়েছে জাতীয় পাট দিবস। দিবসটি উপলক্ষে পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন এবং রপ্তানির প্রতিশ্রুতির কথা বলে যাচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সরকার বলছে, বর্তমানে কৃত্রিম তন্তুর (পলিথিন) ব্যবহার বৃদ্ধি পেলেও টেকসই উন্নয়নের যুগে আবারো বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে পাট রপ্তানি বৃদ্ধি, পাটজাত পণ্যের প্রসার ও বাজার সম্প্রসারণ, দেশের অভ্যন্তরে পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নানা উদ্যোগে পাটের হারানো সুদিন ফেরানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে আবারও পাটকলগুলো খুলে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।









