- জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে রাখছে ভূমিকা
দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষকে শিক্ষা কার্যক্রমের নিয়ে আসার কাজ করে যাচ্ছে সরকার।
স্বাধীনতার পর দেশের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, খ্রিস্টান মিশনারিজসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার নানাবিধ কার্যক্রমের ফলে তারা অর্থনৈতিক মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস। এদের মধ্যে সাঁওতাল সম্প্রদায় অন্যতম। বাংলাদেশে অধিক সংখ্যক সাঁওতাল আদিবাসীরা দিনাজপুর জেলার কাহারোল, বীরগঞ্জ, সদর, ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ি, চিরিরবন্দরে বসবাস করে। সাঁওতালদের সংস্কৃতিচর্চায় লিখিত সাহিত্যের বিকাশ না ঘটলেও লোকগীতি ও লোককাহিনীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। এরা সাধারণত কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে।
সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, আত্ম-নির্ভরশীল এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে শিক্ষার প্রভাব স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আজিজুর রহমান এর দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের উপর শিক্ষার প্রভাব" শীর্ষক এক একাডেমিক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা দেখা গেছে, শিক্ষার প্রভাবে নিরাপদ পেশা, নিরাপদ আয়ের পাশাপাশি গৃহস্থালি সম্পদ, সামাজিকভাবে সুরক্ষা, সামাজিক ক্ষমতায়ন, এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দিনাজপুরের সাঁওতাল ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট যে শিক্ষার প্রভাবে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং সামাজিক রীতিনীতির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছে।
এছাড়াও প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার প্রভাবে তাদের কৃষির নতুন পদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, পোশাকের ধরণ, তৈরি পোশাকে অভ্যস্ত, রাজনৈতিক সংহতি সম্পর্কে সচেতনতা, সঞ্চয়ের অভ্যাস, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, শহরে বসবাসের জন্য স্থানান্তর, সন্তানদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, জমির মালিকানা, সম্পদের কাঠামো, বার্ষিক পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং জীবিকা নির্বাহের কৌশল নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিজয় টুডু বলেন, আমার একটি ছোট দোকান রয়েছে। শিক্ষা গ্রহণের ফলে আমি আমার দোকানের যাবতীয় হিসাব রাখা এবং ক্রয়-বিক্রয়ের কাজ ভালোভাবে করতে পারি। এতে আমার ব্যবসায় ভালো লাভ হয়। এজন্য আমার আর্থিক অবস্থা খুবই ভালো।
গণেশ টুডু বলেন, আমি চাকরি পাওয়ার কারণে আগের চেয়ে ভালো আছি। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন পরিবারে অনেক অভাব ছিলো। চাকরি পাওয়ার পর পরিবারে তেমন অভাব নেই। আর চাকরি পাওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে আমি পড়াশোনা করেছি।
আর্থ-সামাজিক সম্পর্কে হাবিল হাসদা বলেন, আগে অনেকেই তিনবেলা খাবার খাওয়ার মতো সামর্থ্য ছিলো না। কিন্তু এখন আর কারো খাবারের সমস্যা নেই। চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নতি হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আগে এমনটা ছিলো না।
রিনা মুর্মু এবং শিউলি হেমব্রম বলেন, যদিও অনেকেই খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই মিলে নিজেদের ধর্মের উৎসব গুলো পালন করি। আমাদের ধর্ম অনেকটা হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মতো, তবে সম্পূর্ণ নয়। এদিকে উৎসব ছাড়া আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক কেউ পড়ে না। খাদ্যাভ্যাস হয়ে যাচ্ছে অ-আদিবাসীদের মতো। শিক্ষিত হওয়ার ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতন হয়ায় অনেকে হাঁড়িয়া(মদ) সহ ক্ষতিকর খাদ্য থেকে বিরত থাকছে।
গবেষণার সকল উত্তরদাতারা দাবি করে বলেন, আমরা পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়। আমাদের উন্নয়নে বিভিন্নক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধিসহ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।









