- ভিসির পদত্যাগ পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই
টানা ১৩ দিনের আন্দোলন-ঝড় শেষে শান্ত হয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)। সংঘর্ষ, মিছিল, বিক্ষোভ আর উত্তেজনায় শাবি ক্যাম্পাস উত্তাল ছিলো এ ১৩ দিন। তবে পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হলেও উপাচার্য অপসারণের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অহিংস আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার রাতে প্রতিবাদী সংগীত পরিবেশন ও গতকাল বৃহস্পতিবার কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীকে ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে দেখা যায়। তবে অনশন করে অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা হাসপাতাল, হল ও নিজ বাসায় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন।
শাবিপ্রবির বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে গত ১৩ জানুয়ারি দিনগত মধ্যরাতে ওই হলের ছাত্রীরা রাস্তায় নামেন। সেই থেকে আন্দোলনের সূচনা। একদিন পর (১৫ জানুয়ারি) আন্দোলনরতদের ওপর ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে নতুন মাত্রা পায় আন্দোলন। হলের পুরো প্রভোস্ট কমিটির অপসারণ, অব্যবস্থপনা দূর, ছাত্রলীগের হামলার বিচার চেয়ে ১৬ জানুয়ারি শাবির আরও শিক্ষার্থী আন্দোলনে শামিল হন। সেদিন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাকে মুক্ত করতে গেলে পুলিশকে বাধা দেন আন্দোলনকারীরা। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে উপাচার্যকে মুক্ত করে পুলিশ। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ সে সময় সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে। শিক্ষার্থীরাও ছুঁড়ে ইট-পাটকেল। সংঘর্ষকালে পুলিশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ অর্ধশতাধিক লোক আহত হন। এ সংঘর্ষের ঘটনায় তিন শ’ অজ্ঞাত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ১৭ জানুয়ারি রাতে মামলা করে পুলিশ।
মামলার এজাহারে পুলিশ লিখেছে, সেদিন শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর গুলিও ছুঁড়েছিল। এ মামলা প্রত্যাহারে ১৮ জানুয়ারি রাত ১০টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। তবে মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় ১৮ জানুয়ারি আরও উত্তপ্ত হয় শাবি ক্যাম্পাস। ওইদিন ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অপসারণ, প্রক্টর ও ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। ওইদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা ক্যাম্পাসে যান। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলের সঙ্গে ছিলেন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তবে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে ভিসি অপসারণের আশ্বাস না পেয়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা। তারা উপাচার্যের অপসারণ চেয়ে গণসাক্ষর সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বরাবরে চিঠি পাঠান।
আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯ জানুয়ারি দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময়ের মধ্যে ভিসি পদত্যাগ না করায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ওইদিন বিকেল ৩টা থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন ২৪ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে একজনের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি বাড়ি চলে যান। বাকি ২৩ জনের সাথে ২২ জানুয়ারি আরও ৫ শিক্ষার্থী যোগ দেন।
২১ জানুয়ারি দুই দফায় শাবি ক্যাম্পাসে যান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাদেল। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে মুঠোফোনে কথা বলিয়ে দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে। শিক্ষামন্ত্রী অনশন ভাঙতে ও আলোচনায় বসতে আহবান জানান শিক্ষার্থীদের। আলোচনার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দলকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান শিক্ষামন্ত্রী। প্রথমে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও পরে শিক্ষার্থীরা মত বদলে ফেলেন। তবে ২১ জানুয়ারি রাতে শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় যায়। পরদিন (২২ জানুয়ারি) তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বাসায় বৈঠক করেন। বৈঠকের পর ২২ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে শাবির আন্দোলনরতদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি আন্দোলন থেকে সরে এসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অনুরোধ জানান শিক্ষার্থীদের। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর সেই অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৪ জানুয়ারি রাত পৌনে ৮টার দিকে শাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে বিকাল থেকে তাঁর বাসা ঘেরাও করা হয়। পরদিন (২৫ জানুয়ারি) রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় প্রদান করলেও আন্দোলনের অংশ হিসেবে অনশন চালিয়ে যেতে থাকেন ২৮ শিক্ষার্থী। তাদের অবস্থা সময় সময় খারাপের দিকে যেতে থাকলে ঢাকা ছুটে আসেন শাবির সাবেক অধ্যাপক ড. মু. জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হক। তাদের অনুরোধে ১৬৩ ঘণ্টা পর বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে পানি পানের মাধ্যমে অনশন ভঙ্গ করেন শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হককে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে, শাবিপ্রবি’র ছাত্র আন্দোলনে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ৫ শিক্ষার্থীকে ঢাকায় গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল। পরে মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে তাদের সিলেট নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে সিলেট জেলা তাঁতী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লায়েক আহমদ বাদি হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। তবে বুধবার তাদের জামিন প্রদান করেন আদালত।
১৩ দিনের টানা আন্দোলন শেষে বুধবার দুপুর থেকে শাবি ক্যাম্পাস উত্তাপহীন। তবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র শাহরিয়ার আবেদিন গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, ‘অনশন করতে গিয়ে আমাদের ২৮ জন শিক্ষার্থীই অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অনশন ভাঙার দিন সকাল পর্যন্ত ১৬ জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ছিলেন। পরে তাদের হাসপতাল থেকে নিয়ে এসে বুধবার সকালে জাফর ইকবাল স্যারের কথায় অনশন ভাঙি আমরা।
তিনি বলেন, অনশন ভাঙার পর ৬ জন শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হওয়ায় তাদের আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে ৫জনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে তাদের বাসায় নিয়ে আসা হয়। একজন শিক্ষার্থী এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে যারা বাসায় এসেছেন তারা পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও সময় লাগবে। চিকিৎসকদের তত্বাবধানেই তারা আছেন।
শাহরিয়ার আবেদিন আরও জানান, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে- আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে আজ-কালের মধ্যে হলগুলো খুলে দেওয়া হবে। তাই সব শিক্ষার্থী হলে চলে আসবেন। এরপর আমরা ধারাবাহিকভাবে- এই ভিসি’র অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে যাবো।
আনন্দবাজার/এম.আর









