প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রকোপে স্থবির গোটা বিশ্ব। এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরবন্দির একঘেয়েমি আর ভাল লাগছে না শিক্ষার্থীদের। তারা সুস্থ পৃথিবীতে আবার সেই চিরচেনা স্ব স্ব ক্যাম্পাসে ফিরতে চায়। ভালোবাসায় রাঙানো কাছের মানুষগুলোর সঙ্গে আড্ডা দিতে চায়। আবারও মধ্য রাতে গিটার নিয়ে গানের ভুবনে মত্ত থাকতে চায়। কবে ফিরবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনছে শিক্ষার্থীরা। এমনই নিজ ক্যাম্পাসে ফেরা নিয়ে ভাবনার কথা বলেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীরা।
মামুন শেখ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় :
ব্যস্ত নগরীতে দৈনন্দিন জীবনে সকালবেলায় ছুটে চলা মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রিয় ক্যাম্পাসকে গন্তব্য করে সকাল সকাল বাসা থেকে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে পড়া। ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখে সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা মানুষের সাক্ষাৎ এবং দিনের শুরুতে পরিচিত মানুষ পেয়ে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়া, তারপরই নির্দিষ্ট শিডিউল ক্লাসে প্রবেশ, এক এক করে বন্ধুদের সঙ্গে নতুন সকালের কুশল বিনিময় করতে করতেই শিক্ষকের ক্লাসে প্রবেশ। আজ দীর্ঘ প্রায় সাত মাস প্রিয় ক্যাম্পাসে আমাদের আনাগোনা নেই। নেই আজ সকালের ৮. ৩০ টার ক্লাসটি ধরতে রাতে তাড়াহুড়া করে ঘুমতে যাওয়া, নেই ঘুম চোখে ক্লাসের জন্য সকাল সকাল উঠে পড়া এবং ফ্রেশ হয়ে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে ছুটে চলা। আজ নেই একসঙ্গে বন্ধুদের আড্ডায় আসর জমানো। নেই ক্লাসে হইচই করা। নেই ক্যানটিনে একটু রুটি, ডাল বা খিচুড়ি ভাগাভাগি করে একসঙ্গে খাওয়ার গল্প। নেই চায়ের দোকানে বসে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা। সবকিছু কেমন অচেনাঅপরিচিত হতে শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে গল্প-আড্ডা। সকালে ঘুম থেকে উঠে ভার্সিটি বাসের জন্য অপেক্ষা, কিংবা দৌড়ে বাস ধরা থেকে শুরু করে শেষবেলায় সেই বাসেই নিজ গন্তব্যে পৌঁছানো সবকিছুই যেনো মনে হচ্ছে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমাদের একের পর এক ক্লাস শেষে প্রায়ই একসঙ্গে বসে গল্প, আড্ডা, রসিকতা ও বিনোদনে মেতে উঠা প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাসটাতে এখন আর দিতে পারছি না । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া, শান্ত চত্বর, বিবিএ বিল্ডিং, কাঁঠালতলা সহ আমাদের বিভিন্ন আড্ডাস্থল অনেক মিস করছি। ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেলে ভীষণ তৃপ্তি ও শান্তি। সেই সব কিছু ছেড়ে বাসায় বসে অনলাইন ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছি না। দীর্ঘদিন দিন দেখা না হওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে-অপরের খোঁজ-খবর নিচ্ছি।
আমাদের বিশ্বাস একদিন পরিবেশ শান্ত হবে, প্রকৃতি আবার অনুক‚লে আসবে। আমরা আবারও ফিরে যাবো প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাসে।
ফাহমিদা হায়দার তিথী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় :
আকাশ কেন ডাকে মন ছুটি চায় ময়ূরপঙ্খী মেঘ ঐ যায় ভেসে যায় ।। আসলেই আজ মন ছুটি চাচ্ছে।ছুটি চাচ্ছে এই করোনাকালীন বন্দি অবস্থা থেকে। খুব হাপিঁয়ে গেছি।মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে।আসবে নাই বা কেন?প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়া যায় না।যেদিকেই যাই করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে মাস্ক,গেøাবস,ফেস শিল্ড কতোকিছুই না পরতে হয়।আচ্ছা,বলতে পারেন কবে ক্যাম্পাসে ফিরতে পারবো?আদৌ ফিরতে পারবো নাকি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে করোনার থাবায় আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে! মনে পড়ে যায় আমার চিরচেনা ক্যাম্পাসে যাওয়ার লাল “কিঞ্চিৎ”বাসের কথা,আমার কলা অনুষদের আঙ্গিনা,আমার অপরাজেয় বাংলা,টিএসসি, বটতলা,আমতলা,আমার ক্লাসরুম।আমি কি আবার দৌড়ে গিয়ে বন্ধুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতে পারবোক্লাসে জায়গা রাখিস,আমি একটু শ্যাডো তে চা খেয়ে আসি। আবারো কি ক্লাসের মাঝে গুনগুনিয়ে গান গাইতে পারবো?নাহ,আমি মোটেও আর ক্লাস থেকে মনোযোগ হারাবো না।আমি ক্লাস করতে চাই,ক্যাম্পাসে ফিরতে চাই।আমি আবার আমার প্রিয় শিক্ষকবৃন্দের সান্নিধ্যে আসতে চাই,মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কথা শুনতে চাই।বট তলা,আমতলা, টিএসসি তে এক কাপ চা হাতে আড্ডা দিতে চাই।বন্ধুদের সাথে আবারও দলবেঁধে ঘুরতে যেতে চাই।আবারও চাই ডাকসুর সামনে দাড়িয়ে ফুচকা খেতে;কলা ভর্তা খেয়ে অতিরিক্ত ঝাল সহ্য করতে না পেরে চোখ-মুখ লাল করে কোল্ড ড্রিংকস এর জন্য ছুটে বেড়াতে।ক্লাস নোট করার সময় আবারও আমার বান্ধুবিকে ধাক্কা দিয়ে তার হাতের লেখা টা নষ্ট করে দিতে চাই।আর যে ভালো লাগে না ক্যাম্পাস ছাড়া।আমি যে এবার ক্যাম্পাসে ফিরতে চাই।চাই সবকিছু আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাক। প্রাণের ক্যাম্পাসে প্রাণ ফিরে আসুক।
উমর ফারুক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়:
কোভিট ১৯ নামক অদৃশ্য ভাইরাসের সংক্রামণের কারণে দেশে ১৭মার্চ থেকে একযুগে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ফলশ্রæতিতে ক্যাম্পাস ছেড়ে বাড়ীতে চলে আসা। প্রাথমিক পর্যায়ে ছুটি পরিমাণ কম থাকায় গুরুতপূর্ণ বইসামগ্রী নিয়ে আসা হয়নি। করোনা প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ছুটির পরিমাণ বাড়তে-বাড়তে এখন ৬মাস অধিক সময় বাড়ীতেই অবস্থান করছি। এটা এক ধরণের দুশ্চিন্তা ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থা। সরকারী নির্দেশনা মোতাবেগ করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কোন সম্ভবনা নেই। যার কারণে আবারো ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়েছে। হয়ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আবারো ছুটি বাড়বে। কিন্তু এভাবে ঘরবন্দি আর কত দিন। যারফলে পড়াশোনা চরম ব্যাঘাত ঘটছে। বাড়ীতে আসার পড় তেমন পড়াশোনা করার মত মানসিক অবস্থা তৈরি হয়নি। তবে এ অবস্থা থেকে বেড়োনোর পথ বের করতে হবে। এ সমস্যা শুধু আমার একার নয় সকল শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা একইরকম। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সককিছুই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চলছে। আমার মনে হয় এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকে একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত। নয়ত আমাদের এই অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর সমস্যা পড়তে যাচ্ছি। তাই আগামী অক্টোবর মাঝে ধাপে-ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ভাবনা নিয়ে এগোতে হবে সরকারকে।
মাকসুদ জুবায়ের, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়:
করোনা ভাইরাসের প্রকোপে গত ১৮ মার্চ বিশ্বদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে চলমান ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। এই দীর্ঘ বন্ধের কারণে সেশনজটে পড়তে হবে আমাদের। আমরা চাই ক্লাস-পরীক্ষা আগের মত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসুক। না হলে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় পর্যবসিত হবে। তাছাড়া চিরচেনা সেই বিদ্যাপীঠ আর ভালবাসার মানুষগুলোকে দেখিনা অনেকদিন। কিন্তু আজ ঘরে বসে সোনালী অতীতগুলো মনে করা ছাড়া আর কিছু করার নেই আমাদের। প্রতিক্ষণেই হৃদয়ে একটা ভয় জাগ্রত করে, প্রিয়জনদের সাথে আবার দেখা হবে কিনা! ক্যাম্পাসে ফিরে ক্লাসে আবার সবাইকে পাবো কিনা! এখন সুদিনের অপেক্ষার প্রহর গুনছি। প্রার্থনা করি পৃথিবী দ্রæত সুস্থ হয়ে উঠুক। সবাই সুস্থ থাকুক।
আনন্দবাজার/শহক







