দৈনিক আনন্দবাজার — সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

উদ্বোধনের অপেক্ষায় বছর পার

প্রকাশ:

বিস্তারিত

  • হস্তান্তরের ১ বছর পরও চালু হয়নি ছাত্রীনিবাসটি
  • পাঁচতলা ছাত্রীনিবাসটি নির্মাণে ব্যয় পৌনে পাঁচ কোটি টাকা
  • ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনে সরকারি তিনটি হোস্টেল

নরসিংদী সরকারি কলেজের ছাত্রীদের আবাসন-সংকট কাটাতে পৌনে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি পাঁচতলা হোস্টেল। দুই ধাপে নির্মাণ শেষে গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্রীনিবসাটি হস্তান্তর করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে ১ বছর পেরিয়ে গেলেও ১৩২ আসন সংখ্যার হোস্টেলটি উদ্বোধন না হওয়ায় আবাসন সংকটে রয়েছেন কলেজটির ছাত্রীরা।

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত নরসিংদী সরকারি কলেজ জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত। কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ১৬টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সসহ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। এসব শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকের বেশি ছাত্রী। উচ্চ মাধ্যমিকের ফলে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে কলেজটির সুনাম রয়েছে। এছাড়া স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ফলেও সুনাম আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে কলেজটিতে আবাসন হোস্টেল রয়েছে তিনটি। দুইটি ছাত্রদের, একটি ছাত্রীদের। ছাত্রদের হোস্টেলগুলোর মধ্যে দুইতলার জরাজীর্ণ জীতেন্দ্র কিশোর মৌলিক ছাত্রাবাসের আসন সংখ্যা ৬৯ ও তিনতলার বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ছাত্রাবাসের আসন সংখ্যা ৭২। অন্যদিকে ছাত্রীদের চারতলার ডা. জোহরা বেগম কাজী ছাত্রীনিবাসের আসন সংখ্যা ১১০। এর বাইরে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরা কলেজের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজন মিলে বাসা ভাড়া নিয়ে বা অনেকের সঙ্গে মেস করে থাকেন। নরসিংদীর ছয় উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা কলেজটিতে লেখাপড়া করেন।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালে 'শিক্ষার মানোন্নয়নে জেলা সদরে অবস্থিত পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজসমূহের উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নরসিংদী সরকারি কলেজে ছাত্রীদের আবাসন সংকট নিরসনে ১০০ আসনের নতুন একটি হোস্টেল নির্মাণের বরাদ্দ হয়। পাঁচতলা ভিত বিশিষ্ট ভবনটির চারতলা পর্যন্ত নির্মাণে সেনিটারি, ইলেকট্রিফিকেশন ও পানি সরবরাহকরণসহ ৪ কোটি ১১ লক্ষ ৫২ হাজার ৯১৪ টাকা চুক্তিমূল্য নির্ধারিত হয়। ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট তারিখে নির্মাণকাজ শুরুর পর ছয় বছরে ৩ কোটি ৮৮ লক্ষ ৬ হাজার ৮৮ টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের ২ আগস্টে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আজমত ট্রেডিং হোস্টেলটির নির্মাণকাজ শেষ করে।

নির্মাণকাজ চলমান থাকার সময়ই ২০১৮ সালের ৬ মে ভবনটির পঞ্চম তলার উর্ধমুখী সম্প্রসারণের জন্য আবার সরকারি বরাদ্দ আসে। ৩২ আসন সংখ্যার পঞ্চম তলা নির্মাণের কাজ পায় আরেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স নাজমুল হক এন্টারপ্রাইজ। সেনিটারি, ইলেকট্রিফিকেশন ও পানি সরবরাহকরণসহ চুক্তিমূল্য নির্ধারিত হয় ৯৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৬৮ টাকা। তিন বছর পর ৯৬ লাখ ২২ হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয়ে পঞ্চম তলার নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২১ সালের ৪ মে। দুই ধাপে পাঁচতলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ভবনটি হস্তান্তর করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর নরসিংদীর নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার নাজমুল ইসলাম বলেন, ২০২১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে নির্মিত পাঁচতলা ভবনটি আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছি। এর মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন করেছি। তবে, পরবর্তীতে তাতে শিক্ষার্থীদের উঠানোর কাজ কলেজ প্রশাসনের। কলেজ কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে হস্তান্তরের পরপরই ছাত্রী হোস্টেলটি চালু করতে পারত।

কলেজ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ভবনটি হস্তান্তরের সময় তারা জানতে পারেন, দেশের ৬৪ জেলার শ্রেষ্ঠ স্থাপনাগুলোতে একটি করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ভবন একটি বিশেষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে উদ্বোধন করবেন। নরসিংদী সরকারি কলেজ জেলার শ্রেষ্ঠ স্থাপনা হিসেবে এ পাঁচতলা ছাত্রী হোস্টেলটি পেয়েছে। ভবন হস্তান্তরের পরপরই জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও সদর আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে কলেজটির অধ্যক্ষ মোশতাক আহমেদ কথা বলেন। তারা অধ্যক্ষকে বলেছেন, যেহেতু সারাদেশে নির্মিত এসব ভবন একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করার কথা রয়েছে, সেহেতু আমাদের পক্ষে তা উদ্বোধন করা সম্ভব নয়। এ কারণেই তারা অপেক্ষায় আছেন।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হয়েছে, ছাত্রীনিবাসটির নামকরণ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে হোক। এরপরই তাদের দাবির প্রেক্ষিতে কলেজের পক্ষ থেকে এ বিষয়ক ট্রাস্টে একটি আবেদন করা হয়। নামকরণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে নামকরণের সঙ্গে উদ্বোধনের সম্পর্ক নেই, উদ্বোধনের পরেও নামকরণ করা যেতে পারে।

সম্প্রতি কলেজে গিয়ে কথা হয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ১৪ ছাত্রীর সঙ্গে। তাদের মধ্যে চারজনের বাড়ি মনোহরদী, তিনজনের বেলাব, তিনজনের শিবপুর, দুজনের রায়পুরা, একজনের নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও একজনের গাজীপুরের টঙ্গী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেছেন, তারা সবাই কলেজ সংলগ্ন বিভিন্ন বাড়িতে বা মেসে কয়েকজনের সঙ্গে মিলে থাকছেন। খাবার ও থাকা মিলিয়ে মাসে গড়ে তাদের খরচ হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। অন্যদিকে কলেজটির ডা. জোহরা বেগম কাজী ছাত্রীনিবাসে আবাসন সুবিধা পাওয়া কয়েকজন ছাত্রী জানান, সাড়ে তিন হাজার টাকার মধ্যেই তাদের খাবার ও থাকার খরচ হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ ছাত্রীনিবাসটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। কলেজের পুকুরের জলে পড়েছে বড় কয়েকটি সবুজ গাছের মায়ায় ঘেরা সুদৃশ্য ভবনটির প্রতিবিম্ব। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, প্রতিটি কক্ষে বেড, পড়ার চেয়ার-টেবিল ও ফ্যানসহ সবকিছুই প্রস্তুত। শুধু একজন প্রহরী আছেন, পাহারার দায়িত্বে। তবে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বিভাগের বিদায় ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মত কিছু আয়োজন সেখানে হয় বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোশতাক আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, অনেক দূর-দূরান্ত থেকে আমাদের ছেলে-মেয়েরা এ কলেজে পড়তে আসে। ভালো ফলাফলের জন্য তাদের নরসিংদীতে অবস্থান করা খুব জরুরি। অনেক ছাত্রীই কলেজের আশপাশের বাড়ি বা মেসে ভাড়া থেকে পড়াশোনা করছে। এভাবে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার মত অবস্থা কিন্তু সব পরিবারের নেই। আমরা তো চাই, নতুন ছাত্রী হোস্টেলটি আজকেই চালু করে দিতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন, এই আশায় আমরা অপেক্ষা করছি।

তিনি আরও বলেন, তবে বাস্তবতা হল, আমরা যদি দশতলা হোস্টেল ১০টাও বানাই, তবুও কুলাবে না। কলেজটির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে কমিয়ে যদি ৫ হাজারে আনা যায় তবে যদি সমস্যা কাটে। এছাড়া পর্যাপ্ত জায়গা পড়ে থাকার পরও অবকাঠামোর দিক থেকে আমরা খুব পিছিয়ে আছি। আমাদের ১ দশমিক ২৯ একর আয়তনের একটি জমি পড়ে আছে, সেখানে ইচ্ছে করলে ৫-৬ ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। ১০ তলার কয়েকটি ভবন যদি সেখানে নির্মাণ করা যায়, তাহলে কিন্তু আবাসন সমস্যার বেশ খানিকটা সমাধান হয়।