দেশজুড়ে অতি সংক্রামক রোগ হাম এখন উচ্চঝুঁকির পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে ৬১ জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই রোগে গত দেড় মাসে আড়াই শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে ৩৩ হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে, আর ২২ হাজারের বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলেও এখনো মহামারি ব্যবস্থাপনার জরুরি ধাপগুলো পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রশ্ন রয়ে যায় হামের প্রস্তুতি কি শুধু কাগজে?”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিস্থিতিকে ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং টিকার ঘাটতি ও বাড়তে থাকা মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অবস্থায় এটিকে কার্যত মহামারি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত এবং দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে সরকার টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, ডেডিকেটেড ওয়ার্ড চালু করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিলের মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এখনো একীভূত চিকিৎসা প্রোটোকল তৈরি, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, কিংবা মাঠপর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একই মানদণ্ডে চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মহামারি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় অন্যান্য ধাপ—যেমন রোগ নজরদারি জোরদার, ব্যাপক পরীক্ষা, আক্রান্তদের আইসোলেশন, সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিন এবং হাসপাতালের আইসিইউ, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করাও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পাশাপাশি ‘ডেথ রিভিউ’ বা মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও অনুপস্থিত, যা মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক হতে পারত।
এদিকে পরীক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কিটসংকট। বর্তমানে মূলত রাজধানীর একটি ল্যাবেই সীমিত আকারে পরীক্ষা চলছে, যেখানে সক্ষমতা থাকলেও কিটের অভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। ফলে অনেক রোগী শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের দ্রুত বিস্তারের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের ব্যাপক চলাচল, বিশেষ করে নির্বাচন ও ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ বৃদ্ধি। হামের সংক্রমণ ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি—একজন আক্রান্ত শিশু গড়ে ১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে।
শিশুমৃত্যুর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে এবং গুরুতর জটিলতা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অনেক শিশুই হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, এমনকি সেপসিস বা মস্তিষ্কজনিত জটিলতায় ভুগছে। অপুষ্টিও একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের ঘাটতি, পর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভাব, কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং সচেতনতা কার্যক্রমের অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। একই সঙ্গে ‘মহামারি’ শব্দটি ব্যবহার না করায় জনসচেতনতা তৈরি হয়নি বলেও মত দিয়েছেন তারা।
চিকিৎসকদের সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে পরিস্থিতিকে মহামারি ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা, টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং কার্যকর জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করা।









