ঢাকার রাজপথে, বিশেষ করে শাহবাগ কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কোনো সংবাদ সম্মেলন, মিছিল বা রাজনৈতিক কর্মসূচির সামনে দাঁড়ালে আজকাল এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে।
একসময় যেখানে গণমাধ্যমের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাইক্রোফোন, ক্যামেরা আর পরিচিত মুখের সাংবাদিকদের ভিড় থাকতো, এখন সেখানে দেখা যায় শত শত মোবাইল উঁচিয়ে ধরা মানুষ।
কারো গলায় প্রেস লেখা ফিতা, কারো হাতে বুম, কারো বুকে ঝুলছে নিজে বানানো আইডি কার্ড। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এ যেন সাংবাদিকতার এক নবজাগরণ। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি আসলে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা, যা ধীরে ধীরে পেশাদার সাংবাদিকতাকে গ্রাস করছে।
আমি নিজেও একজন মোবাইল জার্নালিস্ট হিসেবে মাঠে কাজ করি। জাতীয় দৈনিকের হয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে প্রায়ই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
আমরা যারা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করি, নিয়ম মেনে সংবাদ সংগ্রহ করি, তাদের জন্য এখন মাঠে কাজ করা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। কারণ, প্রকৃত মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক আর তথাকথিত ‘মোজো’ সাংবাদিকদের ভিড়ে পার্থক্য করাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঢাকায় এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন কিংবা ছাত্র রাজনীতির ইভেন্টগুলোতে হঠাৎ করেই দেখা যাচ্ছে, শত শত ‘মোবাইল সাংবাদিক’ উপস্থিত। এদের বেশিরভাগই আসলে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নয়।
নিজেদের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল কিংবা অনলাইন পোর্টালের নাম ব্যবহার করে তারা মাঠে নেমে পড়েছে। অনেকেই নীলক্ষেত থেকে বানানো আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন সাংবাদিক হিসেবে। কেউ কেউ আবার একাধিক পোর্টালের ‘হেড অব নিউজ’ হিসেবেও পরিচয় দেন।
মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই দেখা যায়, একটি সংবাদ সম্মেলনে যেখানে ১৫-২০ জন পেশাদার সাংবাদিক থাকলেই যথেষ্ট, সেখানে উপস্থিত থাকেন ১০০ জন মোবাইলধারী তথাকথিত সাংবাদিক। তারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ধাক্কাধাক্কি করেন, মাইক্রোফোন ঢুকিয়ে দেন বক্তার মুখের সামনে, এমনকি কখনো কখনো প্রকৃত সাংবাদিকদের কাজেও বাধা সৃষ্টি করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে একদিন একটি সংবাদ সম্মেলন কভার করতে গিয়ে এমনই একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পাশে এক দম্পতি ছবি তুলছিলেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, একজন তথাকথিত মোবাইল সাংবাদিক তাদের দিকে ক্যামেরা তাক করে ভিডিও করছে।
শুধু ভিডিওই না, অপ্রয়োজনীয়ভাবে জুম করে ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করছে। আরও অবাক করা বিষয় হলো, আবার সেই ভিডিও ধারণকারী ভিডিও করার সময় হাসছে, যেন এটি কোনো বিনোদনের বিষয়। অথচ এটি একটি গুরুতর অপরাধ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চরম লঙ্ঘন।
এই ধরনের ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এরা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে পণ্য বানিয়ে ফেলছে। নারীরা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন। মিছিল বা সমাবেশে থাকা নারী অংশগ্রহণকারীদের লক্ষ্য করে ভিডিও করা, ক্লোজ শট নেওয়া, এমনকি অনুমতি ছাড়াই তা প্রকাশ করা এসব এখন সাধারণ চিত্র।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক নারী আন্দোলনকর্মীকে আপত্তিকরভাবে ভিডিও করার অভিযোগে এক তথাকথিত মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিককে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। পরে তিনি ভুল স্বীকার করে মুচলেকা দেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এটি কি শুধু একজনের সমস্যা, নাকি পুরো ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে পড়া একটি গভীর সংকট?
এই তথাকথিত সাংবাদিকদের একটি অংশকে প্রেসক্লাবের সামনেও দেখা যায়। কখনো তারা টাকা ভাগাভাগি করছেন, কখনো খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন। এই দৃশ্যগুলো শুধু বিব্রতকর নয়, এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য লজ্জার।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এদের কর্মকাণ্ডের দায়ভার অনেক সময় প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপরও এসে পড়ে। সাধারণ মানুষ যখন কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তখন তারা পুরো সাংবাদিক সমাজকেই দোষারোপ করেন। ফলে একটি সম্মানজনক পেশা ধীরে ধীরে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
শাহবাগ এলাকায় প্রায়ই দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক মিছিল শুরু হলে একদল তরুণ মোবাইল হাতে সামনে ছুটে যায়। অনেকেই মজা করে এদের ‘রিলস পার্টি’ বলে ডাকেন। তারা মূলত ভিডিও ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে ভিউ থেকে আয় করে। কিন্তু এই ভিউ ব্যবসার পেছনে যে অপসাংবাদিকতা চলছে, সেটি ভয়াবহ।
মাঠে কাজ করতে গিয়ে আমাদের মতো পেশাদার সাংবাদিকদের অনেক সময় পেছনে পড়ে থাকতে হয়। কারণ, আমরা নিয়ম মেনে কাজ করি, দূরত্ব বজায় রাখি, নৈতিকতা মানি। আর তারা কোনো নিয়ম মানে না, শুধু সামনে গিয়ে যেকোনোভাবে ফুটেজ নিতে চায়। ফলে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও আমরা মিস করি।
এই সমস্যার দায় শুধু এই তথাকথিত সাংবাদিকদের নয়। এর পেছনে রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, দুর্বল নীতিমালা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব। মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায় রয়েছে। তারা যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতো, তাহলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। তারা যদি মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে নজরদারি করতো, তাহলে এই অপসাংবাদিকতার বিস্তার কিছুটা হলেও রোধ করা যেত।
এখন সময় এসেছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার। সরকারকে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে মোবাইল জার্নালিজমের জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকবে। কারা সাংবাদিক হিসেবে মাঠে কাজ করতে পারবে, তার একটি স্বচ্ছ তালিকা থাকতে হবে। নিবন্ধন প্রক্রিয়া কঠোর করতে হবে এবং ভুয়া পরিচয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। যারা সত্যিই এই পেশায় আসতে চায়, তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নৈতিকতা, গোপনীয়তা, দায়িত্ববোধ এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। ভিউয়ের জন্য যেসব কনটেন্ট ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, মোবাইল জার্নালিজম নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে সাংবাদিকতাকে আরও গতিশীল করতে পারে। কিন্তু যখন এটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখনই সমস্যা তৈরি হয়।
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। এখানে শুধু ক্যামেরা থাকলেই সাংবাদিক হওয়া যায় না। প্রয়োজন জ্ঞান, নৈতিকতা এবং দায়বদ্ধতা। এই পেশাকে বাঁচাতে হলে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।
নইলে একসময় হয়তো সত্যিকার সাংবাদিক আর তথাকথিত সাংবাদিকের মধ্যে পার্থক্যটাই মুছে যাবে। আর সেই ক্ষতির দায় নিতে হবে পুরো সমাজকেই।
লেখক:
আসাদুল্লাহ গালিভ আল সাদি
সাংবাদিক।









