সিলেট নগরীতে ধারাবাহিক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাসিন্দারা। দিনের বেলাতেই প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা, মোবাইল ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাইরে বের হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট ৪৭টি মামলা হয়েছে। তবে বাসিন্দাদের দাবি, প্রকৃত ঘটনা শতাধিক, কিন্তু ঝামেলা এড়াতে অনেকেই অভিযোগ করছেন না। এদিকে বিভিন্ন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে, বিশেষ করে নির্জন সড়ক ও অন্ধকার গলিতে চলাচলে মানুষ আতঙ্কিত।
চুরি ও ছিনতাই ঠেকাতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসেনি।
নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্ট। বাগবাড়ীর বাসিন্দা ইমন আহমেদ বলেন, “প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের কয়েকটি ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর দিন-দুপুরেও ছেলে মেয়েদের নিয়ে বের হলে মনের ভেতরে আতঙ্ক কাজ করে কখন যেন কি হয়ে যায়।” সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, “বর্তমানে সিএনজিতে একা উঠতেই ভয় লাগে।” তিনি পুলিশের নজরদারি ও চেকপোস্ট বাড়ানোর পাশাপাশি চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
সিলেট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, “নতুন সরকার গঠনের পর দিনের বেলা সিলেটে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা আমাদের জন্য এক বিরাট আতঙ্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিপর্যয় আমাদের জনজীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে।”
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ৪ এপ্রিল আম্বরখানা এলাকায় অটোরিকশায় থাকা অবস্থায় বালাগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ওহী আলম রেজার শিশুপুত্রের গলায় ছুরি ধরে ২০-২২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, “হঠাৎ একজন আমার সন্তানের গলায় চাকু ধরে কথা না বলার নির্দেশ দেয়… তারা আমার পকেটে থাকা ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা নিয়ে নেয়।” তার অভিযোগ, কিছু অটোরিকশা চালক এ চক্রের সঙ্গে জড়িত।
এর আগে সাগরদিঘীরপাড় এলাকায় এক নারীকে লক্ষ্য করে মোটরসাইকেল আরোহীদের হামলার চেষ্টা এবং হাউজিং এস্টেট এলাকায় এক নারীর ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ভাইরাল হয়। পরের ঘটনায় ভুক্তভোগী বিমানবন্দর থানায় জিডি করেন; তার ব্যাগে ১৫ হাজার টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, “নগরীকে চুরি ও ছিনতাই মুক্ত করতে আমরা চেষ্টা করছি… চিহ্নিত ছিনতাকারীদের তালিকা করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।” পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী জানান, ২৬৩ জন ছিনতাইকারীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং এর মধ্যে ৪৪ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে এদের তৎপরতা বন্ধ করতে সমর্থ হব।”
পুলিশের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ছিনতাইয়ের অভিযোগে ১০৩ জন এবং চুরির অভিযোগে ১০৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন পরোয়ানায় একই সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩ হাজার ৪৩ জন। শুধু রোজাতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ১২৯ জন।
নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “চুরি ও ছিনতাই রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে… জিরো টলারেন্স।”









