বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) অর্থনৈতিক অপরাধ ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে বিদেশে পলাতক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে দেশীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পেশাদার তদন্ত সংস্থাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেছেন।
ছয় দেশে আইনি চিঠি: সংসদে দেওয়া লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের বিদেশে পাচার করা সম্পদ উদ্ধারে সরকার অত্যন্ত সক্রিয়। পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের প্রথম ধাপ হিসেবে 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস অ্যাক্ট-২০১২' অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট' (MLAR) পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে এস আলম গ্রুপের বিষয়ে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সাইপ্রাস, জার্সি ও সিঙ্গাপুর—এই চারটি দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে যৌথ বাহিনী ও বিদেশি ফার্ম: মন্ত্রী জানান, এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপের অবৈধ সম্পদ উদ্ধারে দুদক, সিআইডি, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং শুল্ক গোয়েন্দার সমন্বয়ে যৌথ তদন্তকারী দল কাজ করছে। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি পদ্ধতিতেও অর্থ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া বিদেশে সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য চারটি স্বনামধন্য বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োজিত করা হয়েছে।
পাচার করা অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে চিঠির জবাব পাওয়ার পর আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্থ শনাক্ত ও পাচারের বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করতে হবে। এরপরই টাকা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ফলে চলতি বা আগামী অর্থবছরে ঠিক কী পরিমাণ সম্পদ উদ্ধার হবে, তা এখনই সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তবে সরকারের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশের ভঙ্গুর আর্থিক খাতকে টেনে তুলতে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে চার স্তরের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এর আওতায় মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত একটি মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল সভায় এই কৌশলপত্র চূড়ান্ত করা হয়।
নোয়াখালী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে সরকারের এসব পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ গঠন করছে সরকার। বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রবাসীদের বিনিয়োগ আরও সহজ করতে ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালু ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির সাথে মিল রেখে মুদ্রা সরবরাহ (M2) ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো কার্যকর হলে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ফেরার পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিবেশ আরও উন্নত হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।









