জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি); যা আন্দোলনের সামনের সারির নেতৃত্ব থেকেই গড়ে ওঠে।
আত্মপ্রকাশের পরপরই দলটি জনতার একটি অংশের উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হলেও শুরু থেকেই নানা বিতর্ক, নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দলত্যাগের কারণে সংগঠনটি সুনাম ও কাঠামোগত সংকটে পড়ে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে, দলছুট রাজনীতিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা থেকে আগ্রহীদের যুক্ত করে শক্ত অবস্থানের জন্য বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দলটি। শীর্ষ নেতারা বলছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। অন্যদিকে, তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে নব্য দল হিসেবে সংস্কার না হলে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। যার ফল হবে ভয়াবহ।
এদিকে এনসিপিকে বৃহৎ পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং আস্থার জায়গা তৈরি করতে নানামুখী পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। দলকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে টার্গেট করে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করেছে। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ, এমনকি ছাত্রলীগ থেকেও নেতাকর্মীদের দলে ভেড়াচ্ছে নবগঠিত রাজনৈতিক দলটি। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও অন্য দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের টার্গেট করে দলে টানার চেষ্টা করছে গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা নেতাদের এ দল। এনসিপির নেতারা বলছেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নয় বা ছিল না এমন যে কাউকে দলে স্বাগত জানানো হবে।
এ বিষয়ে এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, জনগণের সেবা করার জন্য এনসিপির দরজা সবার জন্য খোলা থাকবে। গণহত্যাকারী এবং ফ্যাসিবাদের সহযোগী, সন্ত্রাস এবং চাঁদাবাজ ছাড়া বাকি সবার জন্য আমাদের দরজা খোলা থাকবে।
এদিকে দলটি গঠনের শুরুতে ব্যাপক জনপ্রিয়তার আভাস থাকলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং দলীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পায়নি।
তবে দলকে চাঙ্গা করতে এবং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে জুলাই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত মাহফুজ আলমসহ দলছুট সামনের সারির নেতাদের ফেরাতে তোড়জোড় শুরু করা হয়েছে। যদিও মাহফুজ ইতোমধ্যে ‘অল্টারনেটিভস’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছেন।
যেখানে এনসিপি থেকে আসা কয়েকজন সাবেক নেতাও রয়েছেন। তবে সংগঠনটি এখনো মাঠপর্যায়ে সক্রিয় কার্যক্রমে তেমনভাবে দৃশ্যমান হয়নি। অল্টারনেটিভসের এক নেত্রী ডা. তাজনূভা জাবীন বলছেন, মাহফুজ আলম সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশজুড়ে সমন্বয় করছেন।
তিনি ভবিষ্যতে আরও সক্রিয় হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। তবে এনসিপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক দাবি করেন, মাহফুজ আলমের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, তবে তিনি দলটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেবেন কি না- তা এখনো নিশ্চিত নয়। অন্যদের বিষয়েও নিয়মিত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানা যায়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব রূপালী বাংলাদেশকে জানান, যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী এবং যারা গণতন্ত্রের জন্য, মানবাধিকারের জন্য দীর্ঘ সময় লড়াই করেছেন, রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, এরকম নানা প্ল্যাটফর্মের নানা সহযোদ্ধা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হতে পারে।
বিএনপি, এবি পার্টি কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের এমন নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ইতোমধ্যে আমাদের দলে অনেকে যোগদান করেছেন। আরও যোগদানের তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে আমাদের এই যোগদান কর্মসূচি চলবে। এছাড়া বিভিন্ন দলের ছাত্র নেতৃত্ব যারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করছেন, তারাও যোগাযোগ করছেন, তারাও আস্তে আস্তে যোগদান করবেন।
ভিশন ৩৬-এর বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ধারাবাহিকভাবে জনআকাক্সিক্ষত বিষয়গুলো নিয়ে মাঠে থাকতে পারলে এবং তাদের সম্পৃক্ত করে কাজ করতে পারলে, ১০ বছরের মধ্যে এনসিপির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় আমরা দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করার কাজ করছি; যেখানে জেলা কমিটি গঠন থেকে শুরু করে সব ইউনিটকে শক্তিশালী করার কার্যক্রম চলছে।
এদিকে বেশ আগেই দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, আমরা ১০ বছরের টার্গেট নিচ্ছি। ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা প্রতিষ্ঠিত হব, ক্ষমতায় যাব, সরকার গঠন করব। আর এ সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় না যেতে পারলে আর রাজনীতি করব না।
প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে দল গুছিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং ৬টি আসনে জয়লাভ করায় দলটির প্রতি সমীহ নিয়ে তাকাচ্ছেন অনেকে। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করা দলটি এবার নিজেদের পরিসর বাড়াতে চায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষকে এক ছাতার নিচে আনতে চায় তারা।
পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদেরও তারা আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এনসিপির ছায়াতলে এসে দেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্য, দেশ গঠনে এগিয়ে আসার জন্য।
সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়েছেন বিএনপি নেতা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও ইউনাইটেড পিপলস (আপ) বাংলাদেশের ৫০ জন নেতাকর্মী। নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ এবং মুখ্য সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত। তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠনের পূর্বে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং যুগ্ম সদস্যসচিব পদে ছিলেন। এ ছাড়া আপ বাংলাদেশের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদও এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। যোগ দিয়েছেন আইমান রাহাদ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন এবং এবি পার্টির ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হক। যুক্ত হয়েছেন বিএনপির আলোচিত নেতাসহ কাফি ও রনি।
অন্যান্যের মধ্যে যুক্ত হয়েছেন হাসান তানভীর, তানভীর আহমেদ কল্লোল, হাসিবুল ইসলাম, এস এন সুইট, ওয়াহিদ আলম, জাহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ জসিমুদ্দিন, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, সুলতান মারুফ তালহা, তৌসিফ মাহমুদ সোহান, ফারহানা শারমিন সূচি, সাজ্জাদ সাব্বির, পুষ্টিবিদ মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম, আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া, আহমেদ করিম চৌধুরী, দিলারা খানম, কাজী সালমান, শোয়েব হাসান রায়হান, মোহাম্মদ সোয়েব হাসান, মুরাদ হোসেন, প্রকৌশলী আবু সাঈদ মোহাম্মদ নোমান, ফাহাদ শাহেদ, প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম উদ্দিন রিয়াদ, মোস্তফা কামাল মাহতিব, আরাফাত ই রাব্বি প্রিন্স, কাজী আহমেদ তামিম, মোহাম্মদ শামীম, বদরুল আলম শাহীন, মোহাম্মদ নাজমুল হক, মাসুমা বিল্লাহ সাবিহা, ফারজানা আক্তার, তাওহীদুল ইসলাম (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের), রকিবুল ইসলাম (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের), সাদাম মুত্তাসিন প্রান্তিক (নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়), মহিউদ্দিন হাসান, মোহাম্মদ নুরুল হাসান, আল মাহবুব প্রমুখ।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাইয়ে আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এক হয়েছিলাম। সেই আকাক্সক্ষা থেকেই এখন আবার তরুণদের শক্তিতে একত্রিত হয়েছি। তিনি আরও বলেন, কে ছাত্রদল, কে ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ এমনকি ছাত্রলীগ থেকে এনসিপিতে এলো, সেটি আমাদের জন্য মূল বিষয় নয়। তারা এনসিপির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠক ও কর্মী হিসেবে কাজ করবে।
এদিকে দলের শীর্ষ নেতাদের থেকে জানা যায়, এনসিপি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের টার্গেট করেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন দলের নেতারা। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ অফার করছেন। শুধু বিদ্রোহী নয়, অন্যান্য দল থেকেও বহিষ্কৃত বঞ্চিতদের দলে ভেড়াতে চায় এনসিপি। এরই মধ্যে আলোচিত সাবেক বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা ও ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দলটি।
এছাড়াও জানা যায়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, দেশে-বিদেশে একাডেমিশিয়ান, পরিচিত নারী মুখসহ সিভিল সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এনসিপির অনেক দিন ধরে আলোচনা চলছে। তাদের মধ্য থেকে বেশকিছু পরিচিত ও আলোচিত মুখ দলটিতে শিগগির যুক্ত হবেন। এর মাধ্যমে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকারি দলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় এনসিপি। এখনো যারা এনসিপিতে যোগ দেওয়ার আলোচনায় থাকলেও পর্যাপ্ত অগ্রগতি আসেনি, তারাও পরিস্থিতি দেখে পরবর্তীতে যুক্ত হতে পারেন। এর মাধ্যমে পরিধি বাড়িয়ে আগামীর রাজনীতির অন্যতম বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার কথা ভাবছে দলটি।









