দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুনর্গঠিত তিন বেতন কমিশন কমিটির জমা দেওয়া সুপারিশে দেশের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে, যেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন এই বেতন কাঠামো একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার। দেশের আর্থিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন মিললে পর্যায়ক্রমে পুরো কাঠামো কার্যকর করা হবে।
নতুন সুপারিশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বেতন বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে ১:৮, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তুলনামূলকভাবে ১৯৭৩ সালের প্রথম বেতন কমিশনে এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪ এবং ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলে ছিল ১:৯.৪। ফলে নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে নিম্ন ও উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বেতনের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে। বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ভাতাসহ মোট আয় ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা হলেও নতুন কাঠামোতে তা প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
একইভাবে ১৯তম থেকে ১ম গ্রেড পর্যন্ত সব স্তরেই উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভারসাম্য বজায় রাখতে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কিছুটা সীমিত রাখা হতে পারে।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৫ম গ্রেড বা তার উপরের কর্মকর্তাদের গাড়ি সেবা নগদায়ন ভাতাকে এই বিশেষ বৃদ্ধির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
এছাড়া বর্তমানে চালু থাকা ১০ ও ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতাকে মূল বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন, যা বাস্তবায়িত হলে বেতন কাঠামো আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো পে-স্কেল কার্যকর হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পে-কমিশন গঠন করে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারা এই বিস্তারিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দেয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সচিব কমিটি বর্তমানে সুপারিশগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। আগামী জাতীয় বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক স্বস্তি বাড়বে এবং দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









