২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন কিশোরগঞ্জের একটি ভোটকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া অপমানজনক অভিজ্ঞতা বদলে দেয় ইনু মিয়ার জীবন। স্থানীয় পশ্চিম জগৎচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন তিনি। সেদিন আর ভোট দেওয়া হয়নি তার। অপমান আর বঞ্চনার ভার বুকে নিয়ে সেখানেই এক কঠিন প্রতিজ্ঞা করেন যতদিন না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, ততদিন তিনি ভাত স্পর্শ করবেন না।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার জগৎচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত সুলায়মান মিয়ার ছেলে ইনু মিয়ার সেই প্রতিজ্ঞা আর ভাঙেনি দীর্ঘ দেড় যুগেও। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন কেউই তাকে ভাত খাওয়াতে পারেননি। রুটি, পুরি, বিস্কুট আর চা খেয়েই কেটে গেছে ১৭ বছর। বয়স এখন ৮০ ছুঁইছুঁই, কিন্তু প্রতিজ্ঞায় ছিলেন অটল।
অবশেষে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। প্রায় ১৭ বছর পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নিজের প্রতিজ্ঞা ভাঙলেন এই প্রবীণ সমর্থক। তার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল, প্রিয় নেতা মো. শরীফুল আলম এমপি হলে তার হাত থেকেই প্রথম ভাত খাবেন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে সেই ইচ্ছা পূরণ হয়। বর্তমানে সরকারের বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম নিজে ইনু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে তাকে হাতে তুলে ভাত খাইয়ে দেন। এর মাধ্যমে ১৭ বছরের এক অনন্য প্রতীকী প্রতিবাদের অবসান ঘটে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে গরু-ছাগলের সঙ্গে বসবাস করছেন ইনু মিয়া। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, শরীরে নেই আগের শক্তি। রোগ-শোকের ছাপ স্পষ্ট। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে আগরপুর বাজারে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে বাড়ি ফেরেন। তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে থাকেন। অভাব-অনটন যেন তার নিত্যসঙ্গী।
একসময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় বাম পায়ে গুরুতর আঘাত পান। এরপর থেকে লাঠি ভর করে চলাফেরা করেন। এখন আর কাজ করতে পারেন না ভিক্ষাবৃত্তি ও সাহায্যের ওপর নির্ভর করেই চলছে জীবন।
স্ত্রী জোছনা খাতুন ও তিন সন্তান নিয়ে তার পরিবার। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান, ছোট ছেলে জাকির হোসেন জুতার দোকানে কাজ করেন, আর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
ইনু মিয়া জানান, ছোটবেলায় ভৈরবে এক জনসভায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-কে দেখে তার প্রতি আকৃষ্ট হন। সেখান থেকেই বিএনপির প্রতি তার ভালোবাসা জন্ম নেয়, যা আজীবন বহন করে চলেছেন।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি। দুঃখ-কষ্টে ভাতও খাইনি। এখন দল ক্ষমতায় এসেছে, তাই সব কষ্ট ভুলে ভাত মুখে তুলেছি।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, ইনু মিয়ার এই প্রতিজ্ঞা এলাকায় সবারই জানা ছিল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে ভাত খাওয়ানো যায়নি। তবে শরীফুল আলম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দল ক্ষমতায় এলে নিজ হাতে তাকে ভাত খাওয়াবেন। অবশেষে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, “দলকে ভালোবেসে এমন ত্যাগ বিরল। ইনু মিয়ার পাশে থাকা আমাদের দায়িত্ব।” তিনি শিগগিরই তাকে একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়া এবং বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।









