রান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুল প্রত্যাশিত শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত বা চুক্তির আভাস ছাড়াই শেষ হয়েছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের মধ্যকার সরাসরি আলোচনা। বহুল প্রতীক্ষিত এই আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি কঠোর অবস্থানে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন বাহিনী অবিলম্বে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশকারী বা সেখান থেকে বের হওয়া সব জাহাজ অবরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি পার হতে হলে সব জাহাজকে টোল দিতে হবে বলে গতকাল ঘোষণা দিয়েছে ইরান।
এর আগে মার্কিন আলোচকদলের নেতা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইসলামাবাদের স্থানীয় সময় গতকাল ভোরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আলোচনায় কোনো সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। জে ডি ভ্যান্সের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত’ প্রস্তাব দেওয়ার পরও এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘অতিরিক্ত দাবি’ করছে। এ ছাড়া আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুই দেশের প্রতিনিধিরা গতকালই ইসলামাবাদ ছেড়েছেন।
এদিকে এই ব্যর্থতার ফলে চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর ফলে গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ইরান হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান শেষ হয়নি বলে গতকাল এক বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
শান্তি আলোচনা শেষ হওয়ার পর পাকিস্তানের বিবৃতিতে উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহবান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে আগামী সপ্তাহে ইসরায়েল ও লেবাননের কূটনীতিকদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে এর মধ্যেই ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। তেফাহতা শহরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে হামলার জন্য প্রস্তুত একটি রকেট লঞ্চার ধ্বংসের দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
ট্রাম্প গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মুক্তভাবে জাহাজ চলাচলের একটি চুক্তি হতে পারে, কিন্তু ইরানের বাধার কারণে তা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অবিলম্বে টোল দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে বের হওয়া সব জাহাজ আটকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সেই জাহাজগুলোকে আটকে দিতে, যেগুলো ইরানকে টোল দিয়েছে।’ পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরান যে মাইন বসিয়েছে, সেগুলো ধ্বংস করার কথাও জানান তিনি।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ‘যে ওই অবৈধ টোল দেবে, সে নিরাপদে চলতে পারবে না। আর ইরান যদি মার্কিন বা অন্য কোনো জাহাজে হামলা চালায়, তাহলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।’ পরে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই এই অবরোধ শুরু হবে।’
ওই পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘আলোচনায় অনেক বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হয়নি।’
এদিকে ইরান পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবায়ি গতকাল দেশটির মেহর নিউজ এজেন্সিকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি তেহরানের জন্য একটি রেড লাইন।
তিনি বলেন, এই প্রণালি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং সেখান দিয়ে চলাচলের জন্য ইরানি মুদ্রায় টোল প্রদান করতে হবে।
সিএনএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এবং হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি কেভিন লিপটাক বলেছেন, কোনো চুক্তি না হওয়ায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ট্রাম্প আবার যুদ্ধ শুরু করতে চাইবেন কি না, তা এখন স্পষ্ট নয়। কারণ এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার আশঙ্কা বাড়ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং মার্কিন অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
সিএনএনের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পাদক নিক রবার্টসনের মতে, আলোচনার এই ব্যর্থতা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে বড় ধরনের ধাক্কা।
বিবিসি সংবাদদাতা জো ইনউড বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরু হবে কি না, তা নিয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি, তবে হামলার আশঙ্কা যে নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা, সিএনএন, তাসনিম









