বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে, দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতকে এখন ‘মধ্যপন্থী ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। প্রতিবেদনে ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কূটনীতিকদের একটি গোপন অডিও রেকর্ডের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে নির্বাচনে জামায়াতের ভালো ফলের সম্ভাবনাকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক কোণঠাসা অবস্থার মধ্যে থাকা জামায়াতে ইসলামী এখন আবারও দেশের মূল রাজনৈতিক স্রোতে ফিরে এসেছে। গত ডিসেম্বরে নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের রাজনীতি দিন দিন ‘ইসলামঘেঁষা’ রূপ নিচ্ছে। ওই বৈঠকের অডিও রেকর্ডে তাঁকে জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করতে শোনা যায়। এমনকি শিবির নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পথ খুলে দিতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চাওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
তবে এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র যে কঠোর চাপের কৌশলও ধরে রেখেছে, সেটিও অডিওতে স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক দাবি করেন, জামায়াত সরকারে গেলেও শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপ করতে সক্ষম। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর হওয়ায়, অর্থনৈতিক ক্ষতির ভয়ে কোনো চরম সিদ্ধান্তে জামায়াত যাবে না বলেই তিনি মনে করেন। প্রয়োজনে সরাসরি ফোন করে পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মতো সম্পর্ক বজায় রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জামায়াতকে ঘিরে ওয়াশিংটনের এই নরম অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, জামায়াত ভারতের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের প্রতীক। দিল্লি দলটিকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখে। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব ভাবমূর্তি বদলের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। দলটির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন। এ লক্ষ্যে তারা ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে চার দফা বৈঠক করেছে এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনে করে, জামায়াত ভালো ফল করলেও সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা সীমিতই থাকবে। তবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা অতীতের দীর্ঘমেয়াদি জোট রাজনীতির স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর এই তৎপরতা দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারেও প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা বৈদেশিক চাপ আগামী অর্থবছরগুলোতে অর্থনীতির গতি ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি বাস্তবায়ন করে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও নগদ প্রবাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।









