ভোরে ঘুম থেকে ওঠা,অফিসে ফোনে কথা বলা অথবা সহকর্মীদের সাথে গল্প করা এসব অনেকের কাছে স্বাভাবিক হলেও জেন-জি প্রজন্মের অনেকের কাছে এগুলোই বড় ধরনের চাপ ও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে। তরুণদের মধ্যে যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সাধারণত তাদের বলা হচ্ছে জেন জি বা জেনারেশন জেড।
এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অনেক তরুণ কর্মী অফিসে ছোটখাটো আলাপ করতে ভয় পান। আবার অনেকেই বড়দের সঙ্গে কাজ করা বা হঠাৎ ফোন ধরতে অস্বস্তি বোধ করেন। ফলে কর্মজীবনের শুরুতেই তারা মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন। আর এই মানসিক চাপের কারণেই অফিসে টিকে থাকার দৌড়ে জেন-জি পড়েছে বিপাকে।
এই প্রজন্মের কর্মক্ষেত্রের চ্যালেন্জগুলো তুলে ধরা হলো:
পেশাদার যোগাযোগের অভাব
জেন-জি প্রজন্মের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক্টিভ হলেও সরাসরি অফিসে সবার সাথে মেশা বা অফিস কালচারের সাথে মানিয়ে নেওয়ার যে দক্ষতা, তাতে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে গেছে।
ব্যক্তিগত জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া
এই প্রজন্ম প্রথাগত ৯টা-৫টা অফিসের ধরাবাঁধা নিয়মে বিশ্বাসী নয়। তারা কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এমন মানসিকতা অনেক সময় পুরনো ধাঁচের করপোরেট সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
ধৈর্যের অভাব ও দ্রুত পরিবর্তন
ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ জেন-জি কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। অনেক নিয়োগকর্তার মতে, এই প্রজন্মের মধ্যে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় ধৈর্য ধরে কাজ করার মানসিকতা বা পেশাদার শিষ্টাচারের অভাব রয়েছে। এই প্রজন্মের মধ্যে ধৈর্যের বেশি অভাব।
প্রযুক্তির ওপর অতি-নির্ভরতা
গ্যাজেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দক্ষ হলেও, কর্মক্ষেত্রে সরাসরি সমস্যা সমাধান বা সূক্ষ্ম 'সফট স্কিল'-এর ক্ষেত্রে তারা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ছে।
এক কথায়, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও অফিস পরিবেশের নিয়মানুবর্তিতা সরাসরি না শিখতে পারাটাই তাদের এই বিপাকের অন্যতম মূল কারণ।
জেন-জি প্রজন্মের জন্য কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা সম্ভব যদি তারা সচেতনভাবে কিছু কৌশল অবলম্বন করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং করপোরেট সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
যা করলে অফিসে টিকে থাকার লড়াই-এ এগিয়ে থাকবেন আপনিও:
১. সামাজিক দক্ষতা বাড়ানো
সরাসরি কথা বলা: ইমেইল বা মেসেজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রয়োজনে সরাসরি বা ভিডিও কলে কথা বলার অভ্যাস করা। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে।
সক্রিয়ভাবে শোনা: মিটিং বা আলোচনার সময় অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করা এবং ফিডব্যাক দেওয়ার আগে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে নেওয়া।
কেউ রাগান্বিত আচরণ করলে সেটাকে ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
২. পেশাদারিত্ব ও শিষ্টাচার বজায় রাখা
অফিস কালচারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা সহায়ক হয়।
সময়ানুবর্তিতা: সঠিক সময়ে অফিসে আসা বা মিটিংয়ে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া।
মার্জিত পোশাক ও আচরণ: ক্যাজুয়াল পোশাকের সুযোগ থাকলেও অফিসের পরিবেশ অনুযায়ী মানানসই পোশাক পরা।
পেশাদার যোগাযোগ: স্ল্যাক বা টিমস-এ মেসেজ করার সময় বন্ধুদের মতো নয়, বরং মার্জিত এবং পেশাদার ভাষা ব্যবহার করা।
৩. মেন্টরশিপ খোঁজা
অভিজ্ঞ সিনিয়রদের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা শেখা ক্যারিয়ারের শুরুতে খুবই কার্যকর হতে পারে।
অফিসের কোনো দক্ষ সিনিয়রকে মেন্টর হিসেবে বেছে নেয়া এবং কাজের জটিলতা বা অফিস পলিটিক্স বোঝার জন্য তার পরামর্শ নেয়া।
বসের কাছ থেকে নিয়মিত ফিডব্যাক চাওয়া যাতে আপনি কোথায় ভুল করছেন এবং কিভাবে উন্নতি করবেন তা দ্রুত বুঝতে পারেন।
৪. অফিস পলিটিক্স ও সহকর্মীদের বোঝা
অফিস মানেই বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের মিলনস্থল। এখানে টিকে থাকতে হলে অফিসের গসিপ বা পরনিন্দা থেকে দূরে থাকুন।
ধৈর্য ধরে খুব দ্রুত সাফল্যের পিছনে না ছুটে কাজের প্রক্রিয়া শেখার দিকে মনোযোগ দিন । ছোটখাটো
মনমালিন্য হলেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।
৫. মানসিক স্বাস্থ্য ও কাজের ভারসাম্য
নিজের সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া ভালো, তবে মনে রাখতে হবে তা যেন আপনার অফিসের কাজের ক্ষতি না করে ।
কাজের সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা করুন, যাতে ব্যক্তিগত সময়ের জন্য কাজের বাড়তি চাপ না থাকে।
অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়লে ম্যানেজার বা এইচআর-এর সাথে খোলামেলা আলোচনা করে কাজের বাড়তি চাপ কমাতে পারেন।
৬.অফিসে কথা বলা নিয়ে অস্বস্তি দূর করার উপায়
নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলাকে ভয় না পেয়ে অভিজ্ঞতা হিসেবে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণ বিষয় দিয়ে কথা শুরু করুন, যেমন কাজ বা অফিসের অভিজ্ঞতা
ব্যক্তিগত প্রশ্ন এড়িয়ে চলুন
অন্যদের কথা মন দিয়ে শুনুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটখাটো আলাপ থেকেই অনেক সময় ভালো সম্পর্ক ও নতুন সুযোগ তৈরি হয়।
৭.ভোরে ওঠার অভ্যাস গড়ার সহজ কৌশল
অফিসে সময়মতো পৌঁছাতে অনেকেই ভোরে উঠতে হিমশিম খান। এজন্য ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কয়েক দিন আগে থেকেই ঘুমানোর সময় এগিয়ে আনুন
আগের রাতেই পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিস প্রস্তুত রাখুন
সকালের কাজগুলো আগে থেকে পরিকল্পনা করুন
এসব ছোট প্রস্তুতি মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
তাই জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের কর্মজীবনে এই ছোট ছোট চ্যালেঞ্জগুলো স্বাভাবিক। তবে নিয়মিত চর্চা ও ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে সহজেই এসব ভয় কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অফিস জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।









