পশ্চিমবঙ্গে সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হলেও এখনো পরাজয় আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি তৃণমূল কংগ্রেস। বরং দলটির শীর্ষ নেত্রী ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় বিজেপি অন্তত একশোটি আসন “ছিনিয়ে নিয়েছে”।
আজ মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে কলকাতার কালীঘাটে মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীর একটি সাংবাদিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় অবস্থান অনুযায়ী, তৃণমূল এখনো জনতার রায়কে পুরোপুরি স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ায় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে এগিয়ে থেকে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পথে রয়েছে।
১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের এই পরাজয়ের পেছনে একাধিক কারণ বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। প্রথমত, নারী ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ভাঙন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’ ও ‘সবুজ সাথী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ভোটারদের সমর্থন পেলেও এবার সেই ভিত্তিতে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারী সুরক্ষা ইস্যু, বিশেষ করে আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক নির্যাতন ও মৃত্যু ঘিরে আন্দোলন, ভোটে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়েছে, যা তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও কিছু ভুয়া বা মৃত ভোটার বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তবুও সামগ্রিকভাবে এর রাজনৈতিক সুবিধা বিজেপির দিকেই গেছে বলে বিশ্লেষণ।
তৃতীয়ত, দীর্ঘদিনের শাসনে দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, চাকরি সংকট এবং সিন্ডিকেট রাজের অভিযোগ তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভোটের আগে ভাতা বাড়ানো বা নতুন প্রকল্প চালু করেও সেই ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া যায়নি।
চতুর্থত, হিন্দু-মুসলিম ভোট বিভাজনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতদিন মুসলিম ভোটের বড় অংশ তৃণমূলের পক্ষে থাকলেও এবার হিন্দু ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে একাধিক জেলায় সমীকরণ বদলে গেছে।
পঞ্চমত, শাসক দল হিসেবে প্রশাসনিক সুবিধা এবার তৃণমূল তুলনামূলকভাবে কম পেয়েছে। নির্বাচন কমিশন ভোটের সময় রাজ্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করে নেয়, বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে এবং একাধিক প্রশাসনিক পরিবর্তন আনে। এতে ভোটারদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও জনমনে অসন্তোষ, প্রশাসনিক সমালোচনা এবং নির্বাচনী সমীকরণের পরিবর্তন মিলেই তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপর্যয় ঘটেছে।









